০১ অক্টোবর ২০২৬ , ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬

রেকর্ড উৎপাদন বলছে পিডিবি, মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ নেই ১৪ ঘণ্টা

বিশেষ প্রতিনিধি
আপলোড সময় : ০৯-০৬-২০২৬
রেকর্ড উৎপাদন বলছে পিডিবি, মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ নেই ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন (ফাইল ছবি)

একদিকে সরকার বিদ্যুতে সর্বোচ্চ উৎপাদনের রেকর্ড প্রচার করছে, অপরদিকে দেশের মানুষ বিদ্যুৎ না পাওয়ার অভিযোগ করছে। এই দুই চিত্র একইসঙ্গে চলতে পারে কিনা এটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব সময় যারা সরকারে থাকেন, তারা জনগণের দুর্ভোগ বিবেচনা না করে নিজেদের অক্ষমতা লুকানোর চেষ্টা করেন। বিদ্যুতের রেকর্ড উৎপাদন, আর সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ নিয়ে দুর্ভোগ—এই দুই চিত্র একত্র করলে হিসাব মেলে না।

চারদলীয় জোট সরকারের সময় বিদ্যুৎ নিয়ে দেশের মানুষের অভিজ্ঞতা খুব একটা ‍সুখকর ছিল না। দেখা যায়, ২০০৫-০৬ সালে সারা দেশে ভয়াবহ লোডশেডিং হতো। তখন গ্রামে ১৬ ঘণ্টা, আর খোদ ঢাকায় ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং করা হতো। এবার বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর বিদ্যুৎ নিয়ে আকস্মিক দুর্ভোগ শুরু হয়।

 

বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য গ্রামীণ জনপদের লম্বা লম্বা বিতরণ লাইনকে দুষেছেন। তিনি বলেছেন, গ্রামে বিতরণ লাইনগুলো অনেক লম্বা হওয়ায় সেখানে কোনও সমস্যা হলে লাইন ঠিক করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে বিলম্ব হয়। মন্ত্রীর ভাষায়, এটা লোডশেডিং নয়, লাইনের বিভ্রাট।

 

কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এই লাইনতো বিএনপি দায়িত্ব নেওয়ার পর হঠাৎই লম্বা হয়ে যায়নি। লাইনগুলো আগেই লম্বা ছিল। তাহলে এখন লোডশেডিং হচ্ছে কেন, এটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

পিডিবির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা কোনও অতিপ্রাকৃতিক বিষয় নয়। সরবরাহ কেমন হবে তা নির্ভর করে উৎপাদনে ওপর। প্রতিদিন সরকারের তরফ থেকে যে উৎপাদন চিত্র দেওয়া হচ্ছে, তাতে বলা হচ্ছে—দেশে তেমন কোনও লোডশেডিং নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ঈদের ছুটিতে কলকারখানা বন্ধ থাকার পাশাপাশি সরকারে বেসরকারি অফিসও বন্ধ ছিল। তখন বিদ্যুতের চাহিদা একেবারে কমে গেছিল। সে সময় টানা বৃষ্টি থাকায় তাপমাত্রাও কম ছিল। ফলে বিদ্যুতের লোডশেডিং খুব একটা ছিল না।

 

ঈদের আগে ২০ মে রাতে পিডিবি জানায়, তারা ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। দেশের ইতিহাসে এত বিদ্যুৎ উৎপাদন আগে আর হয়নি। সরকারের তরফ থেকেও বলা হয়, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে সাধারণ মানুষকে লোডশেডিংয়ের মধ্যে কেন থাকতে হবে?

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘‘বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর উচিত প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা। এতে করে স্বচ্ছতা আসবে। একদিকে আপনি বলতেছেন বিদ্যুতের ঘাটতি নাই, কিন্তু অন্যদিকে গ্রাহকরা বিদ্যুৎ ছাড়া বসে আছেন। ফলে এই সেবা খাতের প্রতি গ্রাহকের অনাস্থা তৈরি হচ্ছে, সেটা থেকে বের হওয়া দরকার। এই অনাস্থাই সরকারের জনপ্রিয়তাকে নষ্ট করছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘সম্প্রতি সরকার বলেছে, তেলের মজুত আছে, অথচ পাম্পে গিয়ে মানুষ তেল পাচ্ছে না। না থাকলে সেটা বলতে সমস্যা কোথায়?’’ তিনি বলেন, ‘‘পুরো চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ দিতে গেলে— যে পরিমাণ জ্বালানি আমাদের প্রয়োজন হয়, অর্থনৈতিকভাবে সেটা সংস্থান আমাদের সম্ভব না। এই কারণে লোডশেডিং করেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে। এটা আগের সরকারও করেছে। এবারও এটা হচ্ছে। কোনও রকম বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে এটা পরিষ্কার করে গ্রাহককে জানানো উচিত।

চট্টগ্রাম, খুলনা এবং ময়মনসিংহ প্রতিনিধি স্থানীয় সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছেন, বিদ্যুৎ নিয়ে সাধারণ মানুষ খুব একটা সন্তুষ্ট নয়। তারাও বলছেন, সরকারের খাতায় লোডশেডিং না থাকলেও মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ থাকছে না, এটাই বাস্তবতা।

তীব্র গরমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সেখানকার জনজীবন। একইসঙ্গে বেড়েছে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায়ও। চট্টগ্রামে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে শিল্প-কারখানায়ও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে নগরের চেয়েও বিদ্যুতের লোডশেডিং বেশি হচ্ছে গ্রামে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকরা। যদিও চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের খাতাপত্রে কোনও লোডশেডিং নেই। অথচ এ হিসাবের মিল নেই বাস্তবতার সঙ্গে।

নগরের চকবাজার থানার মৌসুমি আবাসিক এলাকার বাসিন্দা জামালুদ্দিন হাওলাদার বলেন, ‌‘গত কয়েকদিন ধরে বিদ্যুতের লোডশেডিং অসহনীয়ভাবে বেড়েছে। শুক্রবার বন্ধের দিনেও চট্টগ্রামে অতিরিক্ত গরমের পাশাপাশি প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ বার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। দিনে অন্তত চার-পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। গরমের মধ্যে অসহনীয় লোডশেডিং আমাদের অতিষ্ঠ করে তুলেছে। এটি দ্রুত নিরসন জরুরি।’



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ