০১ অক্টোবর ২০২৬ , ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬

দিবসের আলোচনায় শিশু, বাস্তবতায় শ্রমিক: বদলায়নি চিত্র

বিশেষ প্রতিনিধি
আপলোড সময় : ১৩-০৬-২০২৬
দিবসের আলোচনায় শিশু, বাস্তবতায় শ্রমিক: বদলায়নি চিত্র খেলার মাঠে ছুটে বেড়ানোর বয়সে জীবনের কঠিন বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করছে অনেক শিশু

শৈশবের রঙিন দিনগুলো যেন অনেক আগেই হারিয়ে গেছে জুনায়েতের জীবন থেকে। জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার এই শিশুর বয়স মাত্র ১৪ ছুঁইছুঁই। বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার বদলে তাকে প্রতিদিন ছুটতে হয় লোহার মটরস ও গাড়ির যন্ত্রাংশের কারখানার কাজে। তার বাবা পেশায় একজন ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা। বাবার একার পক্ষে পরিবারের খরচ মেটানো সম্ভব নয়। সে জন্য পড়ালেখা বাদ দিয়ে কাজ করে লোহার দোকানে। ভারী যন্ত্রপাতির শব্দ আর কঠোর পরিশ্রমে কাটে জুনায়েতের দিন। বিনিময়ে পাওয়া ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পরিবারের খরচ মেটাতে সহায়তা করে, আর এটাই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

লোহার শব্দ, ধোঁয়া আর ভারী যন্ত্রপাতির ভিড়ে আটকে গেছে অনেক শিশুর শৈশব। জুনায়েতের মতো শত শত শিশু প্রতিদিন কাজ করছে লোহার কারখানা, মোটর ওয়ার্কশপ এবং গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির প্রতিষ্ঠানে। অল্প বয়সে এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হওয়ায় তারা নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে দিন কাটাচ্ছে।

 

১০ জুন বিকালে পুরান ঢাকার ধোলাইখালে চোখে পড়ে এক কর্মব্যস্ত শিশুকে। চারপাশে যন্ত্রপাতি আর শ্রমের কোলাহল, আর তার মাঝেই কাজ করে যাচ্ছে সে। ময়লা পোশাক আর পরিশ্রমে ক্লান্ত শরীর যেন জীবনের কঠিন বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করছে। তবে মুখের নিষ্পাপ অভিব্যক্তি বলে দেয়, বয়স এখনও খেলার মাঠে ছুটে বেড়ানোর। নাম জিজ্ঞেস করতেই মৃদু হেসে উত্তর দেয়— জসিম।

 

কারখানায় কাজ কখন শুরু হয়েছে জানতে চাইলে ১০ বছর বয়সী জসিম জানায় সকাল ১০টায় শুরু হয়েছে, চলবে রাত ৮টা পর্যন্ত। তাকে দেখা গেছে লালচে আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে লোহা গরম করতে। মাঝে মাঝে হাতটা সরিয়ে নিয়ে আবার এগিয়ে আসছে। কত দিন ধরে কাজ করে জানতে চাইলে ক্ষীণ স্বরে বলেন ‘আমি এখানে গ্যারেজে কাজ করি প্রায় দুই বছর ধরে। তিনশ টাকা ইনকাম করতে পারি। আমার বাবা অসুস্থ। কাজ করতে পারেন না। ঘরে ছোট ভাই-বোন আছে। তাদের খাওয়ানোর জন্যই আমাকে কাজ করতে হয়। আমি জানি এটা ছোটদের কাজ না। কিন্তু না এলে আমাদের সংসার চলবে না। আগে স্কুলে যেতাম। স্কুলে যেতে এখন আর ইচ্ছে করে না।’ তার মতো এমন আরও বহু শিশু শ্রমিকের জীবনের চাকা ঘুরছে এভাবেই।

শিশু..ভারী যন্ত্রপাতির ভিড়ে আটকে গেছে অনেক শিশুর শৈশব

 

সরেজমিনে দেখা যায়, ধোলাইখালের বিভিন্ন লোহা ও যন্ত্রাংশের কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের একটি বড় অংশই শিশু-কিশোর। বয়সের তুলনায় ভারী ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে হয় তাদের। কেউ লোহা কাটছে, কেউ ওয়েল্ডিংয়ের কাজে সহায়তা করছে, আবার কেউ ভারী যন্ত্রাংশ বহন করছে। নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবে এসব শিশু প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে থাকে। সামান্য অসাবধানতা কিংবা যন্ত্রপাতির ত্রুটিতেই ঘটতে পারে গুরুতর দুর্ঘটনা। তবুও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে যেতে হয় তাদের।

আজ ১২ জুন বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য, ‘শিশুশ্রমকে না বলি, শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করি’।

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুসারে, ‘শিশু’ অর্থ ১৪ বছর বয়স পূর্ণ করেনি এমন ব্যক্তি এবং ‘কিশোর’ অর্থ ১৪ বছর বয়স পূর্ণ করেছে এবং ১৮ বছর বয়স পূর্ণ করেনি এমন ব্যক্তি। জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০ অনুসারে, শিশুদের আনুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে দেওয়া যাবে না। কিশোরদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। ক্ষেত্রবিশেষে চিকিৎসকের কাছ থেকে শিশু-কিশোরদের সক্ষমতা সনদ নিয়ে শর্ত সাপেক্ষে হালকা কাজে নিয়োগ দেওয়া যাবে।

বাংলাদেশে শিশুশ্রম এখনও একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ‘শিশুশ্রম জরিপ ২০২২’ অনুযায়ী, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৩ কোটি ৯৯ লাখ। এর মধ্যে কর্মজীবী শিশুর সংখ্যা ৩৫ লাখ ৩৬ হাজার ৯২৭ জন এবং শিশুশ্রমে জড়িত রয়েছে ১৭ লাখ ৭৬ হাজার শিশু।

জরিপ অনুযায়ী, ২০১৩ সালে কর্মজীবী শিশুর সংখ্যা ছিল ৩৪ লাখ ৫০ হাজার; যা বর্তমানে বেড়ে ৩৫ লাখ ৩৬ হাজারে পৌঁছেছে। একই সময়ে শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুর হার ৮ দশমিক ৭০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৯০ শতাংশ হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৪৫ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ রয়েছে; যার মধ্যে ৪১ ধরনের কাজেই শিশুদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম কিছুটা কমেছে। ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে ১০ লাখ ৬৮ হাজার শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে জড়িত; যা ২০১৩ সালে ছিল ১২ লাখ ৮০ হাজার।

আইএলও ও ইউনিসেফের এক জরিপে দেখা যায়, শহরাঞ্চলে শিশুরা প্রায় ৩০০ ধরনের কাজে নিয়োজিত। ৭০৯টি কারখানার ৯ হাজার ১৯৪ জন শ্রমিকের মধ্যে ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ বা ৩ হাজার ৮২০ জনই শিশু।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৫ শতাংশ শিশু। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিবারে শিশুদের আয় সংসারের অন্যতম প্রধান ভরসা। দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট, শিক্ষার সুযোগের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণে অনেক শিশু অল্প বয়সেই শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের মতো পরিশ্রম করলেও শিশুরা সমপরিমাণ মজুরি পায় না। শ্রমিক হিসেবে তাদের আইনি ও সামাজিক স্বীকৃতিও সীমিত। ফলে শিক্ষা, খেলাধুলা এবং স্বাভাবিক শৈশব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা।

হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী, ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের গৃহকাজে নিয়োগ দেওয়া বেআইনি। যদিও ২০১৫ সালে ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালা’ প্রণয়ন করা হয়, তা এখনও পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হয়নি।

২০২৩ সালে শ্রম আইন সংশোধন হলেও গৃহশ্রমিকদের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে তারা শ্রমিক হিসেবে আইনগত অনেক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, অভিযোগ দায়ের কিংবা শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা।

অ্যাকশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্টের (এএসডি) এক জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীর গৃহশ্রমে নিয়োজিত প্রায় অর্ধেক শিশু কোনও না কোনও ধরনের নির্যাতনের শিকার। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৫২ জন শিশুর মধ্যে ১৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ শারীরিক আঘাত, ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ মারধর, ২০ দশমিক ৭৪ শতাংশ বকাঝকা এবং ১ দশমিক ৭ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

এছাড়া বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) গবেষণা অনুযায়ী, গৃহকর্মীদের ৬৭ শতাংশ মানসিক, ৬১ শতাংশ মৌখিক এবং ২১ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৩৬ কোটি ৬০ লাখ শিশু কোনও না কোনও শ্রমে নিয়োজিত। প্রতি ছয় জন শিশুর একজন শ্রমে যুক্ত। পাচার, নির্যাতন ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার শিশুর জীবন বিপন্ন হচ্ছে।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ