০১ অক্টোবর ২০২৬ , ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬

​এডিপির বড় অংশ মেগা প্রকল্পে, সর্বোচ্চ বরাদ্দ রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ১৫-০৬-২০২৬
​এডিপির বড় অংশ মেগা প্রকল্পে, সর্বোচ্চ বরাদ্দ রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্রাফ

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর প্রাধান্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে। এছাড়া মেট্রোরেল সম্প্রসারণ এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পও বড় অঙ্কের বরাদ্দ পাচ্ছে।

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষ ১৫টি বৃহৎ প্রকল্পের জন্য মোট ৫৩ হাজার ৬২২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেলের বিভিন্ন লাইন এবং মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প মিলেই বরাদ্দের অর্ধেকের বেশি পাচ্ছে।

একক প্রকল্প হিসেবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আগামী অর্থবছরে ১৫ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ৫৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা বৈদেশিক সহায়তা থেকে এবং ৮১১ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে।

দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে পরিচিত রূপপুরের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ছিল ৬৮ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে ৯৪ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে ঢাকা গণদ্রুত পরিবহন উন্নয়ন প্রকল্পের (মেট্রোরেল লাইন-৫ উত্তর রুট) জন্য। এ প্রকল্পে ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। রাজধানীর যানজট নিরসন ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। তবে এখন পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ।

তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প। দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে বিবেচিত এ প্রকল্পে আগামী অর্থবছরে ৪ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ২৪ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বড় জাহাজ নোঙরের সুযোগ সৃষ্টি এবং সামুদ্রিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করাই এর মূল লক্ষ্য।

এডিপির খসড়া পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাজধানীকেন্দ্রিক আরও কয়েকটি মেট্রোরেল প্রকল্প বড় অঙ্কের অর্থ পাচ্ছে। ঢাকা গণদ্রুত ট্রানজিট উন্নয়ন প্রকল্প (লাইন-১) আগামী অর্থবছরে ৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেতে যাচ্ছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৫৩ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা হলেও বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৯ দশমিক ২৯ শতাংশ। তবুও এর বরাদ্দ ৩৮৮ শতাংশের বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

অন্যদিকে আংশিকভাবে চালু হওয়া মেট্রোরেল লাইন-৬ প্রকল্পের জন্য ১ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ৭৮ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে থাকায় এর অর্থায়নের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কমেছে।

বিদ্যুৎ খাতেও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ডিপিডিসি) এলাকার বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের জন্য ৩ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

শিক্ষা খাতে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ২ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা এবং মাধ্যমিক শিক্ষায় শিখন ত্বরান্বিতকরণ প্রকল্পের জন্য ১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। পরের প্রকল্পটির বরাদ্দ ২১৭ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়েছে।

এছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পুষ্টি কর্মসূচির জন্য ২ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতির তথ্য এখনো নথিভুক্ত হয়নি। এ কারণে বড় অঙ্কের বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।

পরিবহন খাতে সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প এবং চট্টগ্রাম-দোহাজারী দ্বৈত গেজ রেলওয়ে রূপান্তর প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য অর্থ পাচ্ছে। শিল্পাঞ্চল, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযোগ উন্নত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

তবে সব প্রকল্পের বরাদ্দ বাড়ছে না। ঢাকা-আশুলিয়া উড়াল সড়ক প্রকল্প এবং এলেঙ্গা-হাটিকামরুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পসহ কয়েকটি চলমান বড় প্রকল্পের বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতার ভিত্তিতে এ পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

বরাদ্দ বৃদ্ধির তালিকায় রয়েছে ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। এর বরাদ্দ ৬ দশমিক ৭৯ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ১৪৫ কোটি টাকায় উন্নীত হচ্ছে।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী অর্থবছরের এডিপিতে অবকাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবস্থাপনা খাতকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশ এখনো কয়েকটি মেগা প্রকল্পের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি, ব্যয় দক্ষতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। অতীতে বহু প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি ও সময়সীমা দীর্ঘায়িত হওয়ার অভিজ্ঞতা থাকায় বরাদ্দের পাশাপাশি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়নেও জোর দেওয়া প্রয়োজন।


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ