৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হাসপাতালে সুস্থ হতে এসে পঙ্গুত্বের মুখে আলমগীর : নেপথ্যে থেরাপিস্টের চরম অবহেলা

আপলোড সময় : ২৫-০৬-২০২৬
হাসপাতালে সুস্থ হতে এসে পঙ্গুত্বের মুখে আলমগীর : নেপথ্যে থেরাপিস্টের চরম অবহেলা হাসপাতালে সুস্থ হতে এসে পঙ্গুত্বের মুখে আলমগীর

এ জেড আল মুজাহিদ, কিশোরগঞ্জ : কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক স্ট্রোকের রোগীর চিকিৎসায় চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের ফিজিওথেরাপিস্টের গাফিলতিতে এক বৃদ্ধ রোগীর পা মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছে, যার ফলে তিনি এখন স্থায়ী পঙ্গুত্বের ঝুঁকিতে রয়েছেন।

ভুক্তভোগী মোহাম্মদ আলমগীর হোসাইন (৬০) কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া গ্রামের বাসিন্দা। গত ২ মে স্ট্রোকজনিত কারণে তাকে উক্ত হাসপাতালের এমএমডব্লিউ ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, ৪ মে তাকে হাসপাতালের ফিজিওথেরাপি বিভাগে থেরাপি দিতে নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে, সেখানে কর্তব্যরত ফিজিওথেরাপিস্ট কামরুজ্জামান সোহাগ রোগীর বাম পায়ে থেরাপি মেশিন সংযুক্ত করে বিদ্যুৎ চালু করার পর রোগীকে কোনো প্রকার পর্যবেক্ষণে না রেখেই কক্ষটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। রোগী দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মাত্রার ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। ফলে মেশিনের অনিয়ন্ত্রিত ও অতিরিক্ত তাপের কারণে কিছুক্ষণের মধ্যেই তার পা গুরুতরভাবে পুড়ে যায় এবং বড় বড় ফোসকার সৃষ্টি হয়।

রোগীর চিৎকার ও গোঙানি শুনে পরিবারের সদস্যরা ছুটে এলে ফিজিওথেরাপিস্ট দ্রুত মেশিনটি খোলেন। তবে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি বিষয়টিকে মোটেও পাত্তা দেননি এবং সামান্য মলম ও অ্যান্টিবায়োটিক দিলেই সেরে যাবে বলে আশ্বস্ত করেন। এর পরদিনই, অর্থাৎ ৫ মে তড়িঘড়ি করে রোগীকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র (রিলিজ) দিয়ে দেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর আলমগীর হোসাইনের পায়ের অবস্থা আরও আশঙ্কাজনক রূপ নেয় এবং পুরো পা ফুলে গিয়ে শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। নিরুপায় হয়ে ১২ মে পরিবারের সদস্যরা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের শরণাপন্ন হলে তিনি রোগীর পায়ের ক্ষত দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং এত দ্রুত হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন।

পরবর্তীতে অবস্থা বেগতিক দেখে ১৩ মে রোগীকে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে তিনি দীর্ঘ এক মাস চিকিৎসা নেন। বারডেমের চিকিৎসকরা জানান, যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসা না পাওয়া এবং ক্ষতের ওপর চরম অবহেলার কারণেই পরিস্থিতি এতটা জটিল হয়েছে। বর্তমানে আলমগীর হোসাইন স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতা বা পঙ্গুত্বের চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে জানিয়েছে তার পরিবার। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ ও নিরুপায় হয়ে গত ২১ জুন হাসপাতালের উপ-পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন রোগীর ছেলে মোহাম্মদ আজিজুল হক। তারা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

অভিযুক্ত ফিজিওথেরাপিস্ট কামরুজ্জামান সোহাগ তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করলেও থেরাপি দিতে গিয়ে মাঝেমধ্যে এমন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে স্বীকার করেছেন। এদিকে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর গত ২২ জুন বিষয়টি তদন্তের জন্য ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি জানান, ভুক্তভোগী রোগী চাইলে এই হাসপাতালেই পুনরায় ভর্তি হয়ে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারেন। তবে সরকারি হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্তদের এমন চরম উদাসীনতায় একজন সাধারণ মানুষের জীবন পঙ্গুত্বের মুখে পড়ায় স্থানীয় সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। সবাই এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এবং প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছেন।


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ