ভেনেজুয়েলায় গত বুধবার আঘাত হানা ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যের ক্ষতিগ্রস্ত ভবনসমূহ। ভয়াবহ এই দুর্যোগের তিন দিন পর শনিবার ধ্বংসস্তূপের মাঝে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চলাকালে দৃশ্যটি ধারণ করা হয়। ২৭ জুন, ২০২৬। ছবি: মাতিয়াস দেলাক্রোয়া/এপি
ভেনেজুয়েলের লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যে উদ্ধারকর্মী ও সাধারণ মানুষ যখন ধ্বংসস্তূপের নিচে বেঁচে থাকা মানুষদের খুঁজছে, তখন সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেখানে উত্তেজনা ও মরিয়া ভাব আরও বাড়ছে। দেশটিতে শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের পর এরই মধ্যে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৪৩০ জনে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সময় বুধবার (২৪ জুন) সন্ধ্যায় দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার পর শনিবার পর্যন্ত অন্তত ৬৮ হাজার ৯০০ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য জানিয়েছে পরিবারগুলো।
ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্যগুলোর অন্যতম লা গুয়াইরা। সেখানকার ধসে পড়া কংক্রিটের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে স্বজন ও প্রতিবেশীদের খোঁজে কোদাল, ভারী যন্ত্রপাতি, দড়ি ও খালি হাতেই উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলোও। ধসে পড়া ভবনের ফাটল গলে তাদের ভেতরে ঢোকার দৃশ্য শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর মনে ক্ষীণ হলেও আশার আলো জাগাচ্ছে।
তবে সরকারের অপর্যাপ্ত পদক্ষেপের কারণে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এখন চরমে পৌঁছেছে। দেশটির সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও সামরিক ক্যাডেটদের উপস্থিতি থাকলেও এত বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় তাদের প্রস্তুতিতে স্পষ্ট ঘাটতি লক্ষ করা গেছে। এর মধ্যেই সরকারি তৎপরতা খুব জোরালো, সরকারের এমন একটি ভাবমূর্তি জাহির করার চেষ্টায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
সহায়তা সংস্থাগুলোর মতে, ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষকে জীবিত উদ্ধারের জন্য প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। তবে খাবার ও পানির উৎস থাকলে এই সময়সীমা আরও বাড়তে পারে। ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শনিবার পর্যন্ত ১ হাজার ৬০০-রও বেশি উদ্ধারকর্মী নিয়ে ১৭টি বিমান দেশটিতে অবতরণ করেছে।
ভূমিকম্পের পর ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ায় প্রতিটা মুহূর্ত পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের আশা ম্লান হয়ে আসছে।
উপকূলীয় শহর কারাবায়েদায় স্বজনদের খুঁজতে থাকা মিলেইদি রোমেরো বলেন, ‘কাল রাতের পর থেকে ওখানে লাশের স্তূপ জমে আছে। এর মধ্যে নবজাতক শিশুও আছে। গতকাল রাত ৮টার সময়ও নিচে মানুষ জীবিত ছিল, কিন্তু তাদের উদ্ধারে কেউ এগিয়ে আসেনি। আমরা কয়েকটি মরদেহ শনাক্ত করেছি, সেগুলো উদ্ধারেও কেউ সাহায্য করেনি। তারা আসলে কীসের অপেক্ষা করছে?’
ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ১৪ হাজারের বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে ওই এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত এবং বিশেষ অনুমতি ছাড়া সেখানে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে দুর্গত এলাকার বহু মানুষের অভিযোগ, সরকারের কোনো তৎপরতাই তাদের চোখে পড়েনি।
কেউ কেউ ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষে উঠে নিখোঁজ স্বজনদের নাম ধরে ডাকছিলেন, যদি জীবিত থাকার কোনো সাড়া পাওয়া যায়। উপকূলীয় এলাকাগুলো ধুলায় ছেয়ে গেছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে পচনশীল মরদেহের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া অনেকেই মাস্ক ব্যবহার করছেন।
লা গুয়াইরার অন্য এলাকাগুলোতে হাসপাতালের একটি পার্কিং লটে সারি সারি মরদেহ রাখা হয়েছে শনাক্তকরণের জন্য। সেখান থেকে সাদা ব্যাগে মোড়ানো কিংবা খোলা অবস্থায় থাকা মরদেহগুলো ট্রাকে তোলা হচ্ছিল।
কোনো রকমের সেফটি হেলমেট বা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছাড়াই, কেবল মোটরসাইকেলের হেলমেট মাথায় দিয়ে উদ্ধারকর্মী ও সাধারণ মানুষ ধ্বংসস্তূপের মাঝে হাতড়াচ্ছেন। সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে একসময়ের ব্যবহার্য জিনিসপত্র—সিনেমার ডিভিডি, রান্নাঘরের সিঙ্ক, তোশক আর জুতো।