নাইক্ষ্যংছড়িতে এইচএসসি পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের হাতে অনিয়মিত প্রশ্নপত্র, অনিশ্চয়তায় ফলাফল
সংগৃহীত ছবি
* নিয়মিত শিক্ষার্থীদের হাতে অনিয়মিত প্রশ্নপত্র
* লাইব্রেরিয়ানকে পরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ
* সিসি ক্যামেরার নির্দেশনা উপেক্ষা
* অনেক শিক্ষকের নিয়মিত অনুপস্থিতির অভিযোগ
* শিক্ষার্থীদের ক্ষতি এড়াতে বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনায়, তদন্ত শুরু
এস.এম. হুমায়ুন কবির, কক্সবাজার ব্যুরোচীফ : বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার হাজী এম এ কালাম সরকারি কলেজে এইচএসসি পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত (ইরেগুলার) পরীক্ষার্থীদের এমসিকিউ প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার অভিযোগে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। একই ঘটনার তদন্তে পরীক্ষা পরিচালনায় একের পর এক অনিয়মের তথ্যও সামনে আসছে। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২ জুলাই অনুষ্ঠিত বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষায় চলতি বছরের নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের হাতে ভুলবশত গত বছরের অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের এমসিকিউ প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়। শিক্ষা বোর্ডের বিধিমালা অনুযায়ী একজন পরীক্ষার্থীকে বহুনির্বাচনী (এমসিকিউ) ও সৃজনশীল অংশে পৃথকভাবে উত্তীর্ণ হতে হয়। ফলে নিয়মিত শিক্ষার্থীরা অনিয়মিত প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেওয়ায় তাদের ফলাফল ও শিক্ষাজীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
পরীক্ষাকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রতিটি পরীক্ষার হলে অন্তত ৮ থেকে ১০ জন নিয়মিত পরীক্ষার্থী এ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। সে হিসাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী এ ঘটনার শিকার হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সম্পর্কে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
অনেক শিক্ষার্থী হলের মধ্যেই বিষয়টি হল পরিদর্শকদের জানালেও তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেকেই পরীক্ষা শেষে বিষয়টি জানতে পেরে হতাশা প্রকাশ করেন।
পরীক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে কঠোর পরিশ্রম করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন। প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাস করেও নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ কর্তৃপক্ষের এমন অবহেলার কারণে আজ তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তিনি শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি পরীক্ষার হল সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। এছাড়া পরীক্ষার দায়িত্বে মনগড়া নিয়মে একজন লাইব্রেরিয়ানকে দায়িত্ব দেওয়া এবং কলেজের অনেক শিক্ষক নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে জানতে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জাফর আলমের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করে কেটে দেন। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এনামুল হাসান বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত হয়েছেন এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন। ইতোমধ্যে তিনি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। শিক্ষার্থীদের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে এবং শিক্ষা বোর্ড প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও জানান, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব হল পরিদর্শককে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। লাইব্রেরিয়ানকে পরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে শরীরচর্চা শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগের পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার তদন্তও শুরু হয়েছে।
এদিকে, বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় ভুল প্রশ্নপত্র বিতরণের বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর স্থানীয় সাংবাদিক হামিদুল হক চৌধুরী অভিযোগ করেন, কলেজ কর্তৃপক্ষ তার পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে তাকে মানসিকভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার উপজেলা পরিষদ চত্বরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। মানববন্ধনে তারা এইচএসসি পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, একটি প্রশাসনিক অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতির দায় কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের ওপর বর্তাতে পারে না। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। তাই শিক্ষা বোর্ডকে দ্রুত এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে কোনো পরীক্ষার্থীর ফলাফল বা উচ্চশিক্ষার সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। একই সঙ্গে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণেরও দাবি জানান তারা।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একটি পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র বিতরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এমন অব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের শাস্তি এবং শিক্ষার্থীদের ক্ষতি এড়াতে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
কমেন্ট বক্স