ছবিঃ সংগৃহীত
সমাজে প্রায়ই চোখে পড়ে, মানুষকে যাচাই করা হয় তার বাহ্যিক চাকচিক্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, ধন-সম্পদ কিংবা পদ-পদবি দিয়ে। আচার-অনুষ্ঠান, সেবাগ্রহণ বা কেনাকাটার সময়ও এসব দেখে কাউকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। অথচ ইসলাম এ প্রবণতাকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে এবং মহান আল্লাহ মানুষের মর্যাদার ভিত্তি নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মানুষ, আমি তোমাদের এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি; যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
আয়াতটি স্পষ্ট করে দেয়— মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি তাকওয়া, ধন-সম্পদ কিংবা বাহ্যিক রূপ নয়।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘হে লোক সকল! শোনো, তোমাদের প্রতিপালক এক, তোমাদের পিতা এক। শোনো, আরবির ওপর অনারবির এবং অনারবির ওপর আরবির, কৃষ্ণকায়ের ওপর শ্বেতকায়ের এবং শ্বেতকায়ের ওপর কৃষ্ণকায়ের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নেই। শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা আছে তো শুধু তাকওয়ার কারণে।’ (মুসনাদে আহমাদ)
বর্তমান সমাজে প্রায়ই দেখা যায়— দামি পোশাক, ব্র্যান্ডেড জুতা, বিলাসবহুল গাড়ি কিংবা উঁচু পদমর্যাদা থাকলে মানুষ বাড়তি সম্মান পায়।
অথচ সৎ ও আল্লাহভীরু অথচ সাধারণ পোশাকে থাকা মানুষটি তেমন গুরুত্ব পান না। আবার উল্টো চিত্রও আছে— ইসলামী পোশাক বা দ্বিনি পরিচয়ের কারণেও কাউকে ছোট করে দেখা হয়। টুপি, পাঞ্জাবি, দাড়ি কিংবা শরয়ি পর্দা মেনে চললে কাউকে ‘ব্যাকডেটেড’, ‘কম আধুনিক’ বা ‘অযোগ্য’ ভাবা হয়; অথচ বাস্তবে তিনি হয়তো উচ্চশিক্ষিত, বড় পদমর্যাদার অধিকারী কিংবা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ব্যক্তি। ইসলাম এ দুই ধরনের মানসিকতাকেই নাকচ করেছে।
কারণ বাহ্যিক স্টাইল বা পোশাক দিয়ে মানুষকে বিচার করা যেমন ভুল, তেমনি আল্লাহর বিধান মানার কারণে কাউকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করাও গুরুতর অন্যায়— কখনো কখনো ঈমানের জন্যও ঝুঁকি।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে ঈমানদাররা, কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে বিদ্রুপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রুপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর কোনো নারীও যেন অন্য নারীকে বিদ্রুপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রুপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর তোমরা একে অপরের নিন্দা কোরো না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ উপনামে ডেকো না। ঈমানের পর মন্দ নাম কতই না নিকৃষ্ট! আর যারা তাওবা করে না, তারাই তো জালিম।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)
অর্থাৎ পোশাক, সামাজিক অবস্থান বা চেহারা দেখে যাকে সাধারণ মনে হচ্ছে, আল্লাহর কাছে তিনিই হয়তো বেশি মর্যাদাবান। দুনিয়ার বিচারেও তিনি হতে পারেন বড় ব্যক্তিত্ব। আবার কোনো বড় ব্যক্তিত্বকে কেবল ইসলামী পোশাক ও রীতিনীতি পালনের কারণে জেনেশুনে অবজ্ঞা করা হলে, কৌশলে অপমান করা হলে কিংবা প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলে তা ঈমানকেও ঝুঁকিতে ফেলে; কারণ সেখানে ব্যক্তিকে নয়, ইসলামকেই অবজ্ঞা করা হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আপনি তাদের প্রশ্ন করলে অবশ্যই তারা বলবে, আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও খেল-তামাশা করছিলাম। বলুন, তোমরা কি আল্লাহ, তার আয়াতসমূহ ও তার রাসুলকে বিদ্রুপ করছিলে? তোমরা এখন অজুহাত দেখিয়ো না, তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরি করেছ, যদিও আমি তোমাদের মধ্য থেকে কতককে ক্ষমা করে দিই, তবু কতককে শাস্তি দেবই। কারণ তারা অপরাধী ছিল।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৬৫-৬৬)
অর্থ-সম্পদে কম বলে কাউকে তুচ্ছ করারও সুযোগ নেই। কুরাইশ নেতারা চেয়েছিলেন, মহানবী (সা.) দরিদ্র সাহাবিদের সরিয়ে তাঁদের অভিজাত লোকদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করুন; কিন্তু মহান আল্লাহ তা পছন্দ করেননি, বরং আয়াত নাজিল করে সেই অন্যায় আবদার প্রত্যাখ্যানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যেসব লোক সকাল-সন্ধ্যায় তাদের রবের ইবাদত করে এবং এর মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টিই কামনা করে, তাদের তুমি দূরে সরিয়ে দেবে না, তাদের হিসাব-নিকাশের কোনো কিছুর দায়িত্ব তোমার ওপর নয় এবং তোমার হিসাব-নিকাশের কোনো কিছুর দায়িত্বও তাদের ওপর নয়। এর পরও যদি তুমি তাদের দূরে সরিয়ে দাও তাহলে তুমি জালিমদের মধ্যে শামিল হয়ে যাবে।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৫২)
তাই সেবা দেওয়ার সময় ধনী-গরিবের হিসাব নয়; যার হক, তাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। ঘরোয়া অনুষ্ঠান কিংবা আত্মীয়-বন্ধুমহলে অর্থ-সম্পদ ও বাহ্যিক বেশভূষাকে প্রাধান্য দিয়ে অন্যদের ছোট করা চলবে না। দ্বিনি পোশাক বা ইসলামী পরিচয়ের কারণেও কাউকে অবমূল্যায়ন করা যাবে না।
মনে রাখা দরকার, মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হবে তার চরিত্র, আমানতদারি, দ্বিনদারি, মানবিকতা ও তাকওয়ার ভিত্তিতে। টাকা, ক্ষমতা, পদ-পদবি, ফ্যাশন কিংবা বাহ্যিক সৌন্দর্য— সবই ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু তাকওয়া ও সৎ আমলই দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা ঠিক করে দেয়।