০৭ অক্টোবর ২০২৬ , ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬

জার্মানির সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান গ্রেফতারে যুক্তরাজ্যের দুশ্চিন্তা কেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ০৭-১০-২০২৬
জার্মানির সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান গ্রেফতারে যুক্তরাজ্যের দুশ্চিন্তা কেন? ছবিঃ সংগৃহীত

জার্মানির আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গোয়েন্দা কেলেঙ্কারির জেরে যুক্তরাজ্যের গোপন তথ্য ও গোয়েন্দা এজেন্টদের পরিচয় ফাঁস হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে নেমেছে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। গুপ্তচরবৃত্তি ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে জার্মানির পররাষ্ট্রবিষয়ক গোয়েন্দা সংস্থা বিএনডির সাবেক প্রধান অগাস্ট হ্যানিং এবং সংস্থাটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ‘ম্যানফ্রেড ডি’কে। তাঁদের গ্রেফতারের পরই বড় ধরনের এই নিরাপত্তা-শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অগাস্ট হ্যানিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ম্যানফ্রেড ডির সহায়তায় টানা ১৬ বছর ধরে অবৈধভাবে বিএনডির শ্রেণিবদ্ধ বা অত্যন্ত গোপন নথিপত্র সংগ্রহ করে আসছিলেন এবং এর কিছু অংশ একটি বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে বিক্রিও করেছেন। জার্মান নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গ্রেফতার হওয়া দুজন যেসব উচ্চপর্যায়ের স্পর্শকাতর তথ্য আদান-প্রদান করেছেন, তার একাংশের উৎস ছিল বিদেশি মিত্র গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ফলে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য অন্যের হাতে চলে যাওয়ার জোরালো আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কাজ করা মার্কিন ও ব্রিটিশ গোপন এজেন্ট বা তথ্যদাতাদের পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ও তৈরি হয়েছে।

হঠাৎ সামনে আসা এই কেলেঙ্কারিতে গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেছে পশ্চিমা গোয়েন্দা মহল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, তথ্য ফাঁসের এ ঘটনা শত্রুভাবাপন্ন বা বিদেশি কোনো শক্তির জন্য বড় সাফল্য এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় জোটের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট সময়ে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে যত স্পর্শকাতর তথ্য ভাগ করা হয়েছিল, তার সবই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা করে দেখছে যুক্তরাজ্যের এমআই-সিক্স ও জিসিএইচকিউসহ বেশ কয়েকটি মার্কিন সংস্থা। এ ফাঁসের ফলে যেসব মানবসম্পদ ও এজেন্ট বিপদে পড়তে পারেন, তাঁদের সুরক্ষা দেওয়াই এ পর্যালোচনার মূল লক্ষ্য। ধারণা করা হচ্ছে, জার্মানির অন্যান্য গোয়েন্দা অংশীদার দেশও একই রকম অডিটে হাত দিয়েছে।

নিরাপত্তা লঙ্ঘনের এ ঘটনা জার্মান কর্মকর্তারা গ্রেফতারের আগে ঠিক কোন সময়ে মিত্রদের জানিয়েছিলেন, তা পরিষ্কার নয়। তবে ধারণা করা হচ্ছে, গ্রেফতারের আগেই মিত্রদের এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছিল। জার্মান গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, রাশিয়ার সামরিক বাহিনী এবং বিদেশি অংশীদার সংস্থাগুলোর শ্রেণিবদ্ধ নথিপত্র ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে আছে।

অগাস্ট হ্যানিং ছয় বছর বিএনডির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ২০০৫ সালের নভেম্বরে অবসর নেন। এরপর তিনি তীব্র আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েন এবং দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়। অপরদিকে ম্যানফ্রেড ডি ছিলেন সে সময়ে তাঁর চিফ অব স্টাফ; পরে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও হ্যানিংয়ের সঙ্গে কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালের মার্চ থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত একাধিক বিএনডি সভাপতির চিফ অব স্টাফের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। এই পদে থাকায় বিএনডি সভাপতির দপ্তরে তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে এবং কোন গোয়েন্দা তথ্য কখন দেওয়া হবে তা ঠিক করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নিজস্ব তথ্য গোপন রাখার কৌশল হিসেবে প্রতিটি গোয়েন্দা সংস্থাই নির্দিষ্ট সীমারেখা অনুসরণ করে। কিন্তু ম্যানফ্রেড ডি অত্যন্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন বলে বিএনডির হাতে আসা প্রায় সব গোয়েন্দা তথ্যেই তাঁর ব্যাপক প্রবেশাধিকার ছিল। জার্মানির ফেডারেল প্রসিকিউটর অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক প্রধান হ্যানিংকে তিনি প্রায় দুই হাজার নথি সরবরাহ করেছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। দুজনের মধ্যে ২০১০ সালের বসন্তে একটি আর্থিক চুক্তি হয়েছিল; সেই চুক্তির আওতায় অর্থের বিনিময়ে ম্যানফ্রেড ডি তাঁর সাবেক প্রধানের কাছে নিয়মিত বিএনডির মূল্যবান গোয়েন্দা তথ্য পাঠাতেন। প্রসিকিউটররা বলছেন, লেনদেন হওয়া নথির অনেকগুলোতেই ছিল অত্যন্ত গোপন তথ্য, যেগুলো শুধু অভ্যন্তরীণ কাজের জন্য এবং বিশেষভাবে শীর্ষ নির্বাহীদের কাছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়েছিল।

প্রসিকিউটর অফিসের ভাষ্য, এসব তথ্য অগাস্ট হ্যানিং কাজে লাগাতেন তাঁর ব্যক্তিগত পরামর্শক বা কনসালটিং কাজে। অন্তত একটি ক্ষেত্রে ম্যানফ্রেড ডির কাছ থেকে পাওয়া শ্রেণিবদ্ধ গোয়েন্দা তথ্য কাজে লাগিয়ে তিনি এক বিদেশি গোয়েন্দা কর্মকর্তার জন্য একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছিলেন। তবে নথিটি শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত প্রাপকের কাছে পৌঁছেছিল কি না, সে বিষয়ে তদন্ত এখনো চলছে। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডার স্পিগেলের তথ্য অনুযায়ী, ওই বিশ্লেষণ তৈরি করা হয়েছিল আজারবাইজানের গোয়েন্দা সংস্থার জন্য।

অথচ জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনাগুলোতে মস্কোর বিরুদ্ধে বেশ কঠোর অবস্থানেই দেখা গিয়েছিল হ্যানিংকে। ২০২৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে জার্মানিকে সতর্ক করে তিনি বলেছিলেন, দেশটি অত্যন্ত অবাস্তব বা সরল চিন্তার মধ্যে আছে এবং সম্ভাব্য যুদ্ধের বাস্তবতা নিয়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য ছিল, রাশিয়ার সঙ্গে যে ইতিমধ্যে একটি সংঘাত চলছে, তা অনেকেই বুঝতে পারছেন না এবং বিষয়টিকে খাটো করে দেখা হচ্ছে। মানুষ সত্য এড়িয়ে যাচ্ছে, কারণ রাশিয়া ন্যাটোর সঙ্গে দ্বন্দ্বে রয়েছে এবং জার্মানি নিশ্চিতভাবেই সেই সংঘাতের অংশ। রাশিয়ার প্রতি সহানুভূতি রয়েছে বিশেষ করে পূর্ব জার্মানিতে এবং চরম বাম ও চরম ডানপন্থীদের মধ্যে, যাঁরা মস্কোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম দ্য ইনসাইডার জানিয়েছে, বিএনডি ছাড়ার পর অন্তত সাতবার রাশিয়া সফরে যান হ্যানিং। এসব সফর হয়েছিল ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে, আর অনেক সময় তিনি মস্কোয় থাকতেন মাত্র এক দিন করে।

বিএনডির বর্তমান সভাপতি মার্টিন ইয়েগার বলেছেন, সংস্থাটি শুরুতেই খুব দ্রুত অভ্যন্তরীণ তদন্তে নামে এবং সেখানে প্রাথমিক সন্দেহের সত্যতা পাওয়া যায়। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রশ্নে বিএনডি কোনো ধরনের আপস করবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, এ ঘটনার কারণে তাঁর কোনো লক্ষ্য বা অগ্রাধিকার বাধাগ্রস্ত হবে না।

এমআই-সিক্সের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ম্যাথিউ ডান বলেন, বিএনডির সঙ্গে ভাগ করা সব তথ্য ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে দেখছে; এতে কতটা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা-ও যাচাই করা হচ্ছে। অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য একটি অংশীদার সংস্থার সঙ্গে তথ্য ভাগ করার পর এমন ঘটনা ঘটায় এমআই-সিক্সের ভেতরে ব্যাপক পর্যালোচনা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যার উদ্দেশ্য কোনো কার্যক্রম বা এজেন্টের তথ্য উন্মোচিত হয়েছে কি না তা বোঝা। তবে তিনি মনে করেন, এ ঘটনার কারণে বিএনডির সঙ্গে সুসম্পর্কে ফাটল ধরবে না। দুই সংস্থা যৌথভাবে কাজ অব্যাহত রাখবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্য কোনো দেশকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়ার সময় তথ্যের উৎস ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে গোপন বা পরিমার্জন করার নিয়ম চালু রয়েছে।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ