০৭ অক্টোবর ২০২৬ , ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬

হামলার রাতে থানায় কী ঘটেছিল: মামলা নিয়ে মন্ত্রী ও সালমানের ভিন্ন ভাষ্য

বিশেষ প্রতিনিধি
আপলোড সময় : ০৭-১০-২০২৬
হামলার রাতে থানায় কী ঘটেছিল: মামলা নিয়ে মন্ত্রী ও সালমানের ভিন্ন ভাষ্য ছবি: সংগৃহীত
সালমান মুক্তাদিরকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি যা ঘটছে, তা এখন আর শুধু একটি স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর বা ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির গণ্ডিতে আটকে নেই। একের পর এক তাঁর বক্তব্য, বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলা, পরে সে অবস্থান থেকে পিছিয়ে আসা এবং সর্বশেষ টকশোতে সরকারের উদ্দেশে সরাসরি চ্যালেঞ্জ—এসবের সম্মিলনে বিষয়টি ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছেছে। এ কারণে হামলার পেছনের আসল কারণ কী, তাঁর অভিযোগের ভিত্তি কতখানি নির্ভরযোগ্য এবং ঘটনায় অন্য কোনো পক্ষ জড়িত কি না—এই প্রশ্নগুলোর জবাব পাওয়া এখন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে সালমান মুক্তাদির সুপরিচিত। সম্প্রতি তাঁর ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিও’তে হামলা ও ভাঙচুর হলে তা নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক অঙ্গনেও এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া আসে। তখন থেকেই সমাজমাধ্যমে নানা আলোচনা চলছে—ঘটনার আগে ও পরে কী হয়েছিল, হামলার আসল কারণ কী এবং কোনো রাজনৈতিক পক্ষ এর সঙ্গে জড়িত ছিল কি না। প্রশ্ন উঠেছে বিশেষত সালমানের বক্তব্য ঘিরে। হামলার পর ফেসবুক লাইভে এসে তিনি অভিযোগ করেছিলেন, বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করেছেন। তবে পরে তিনি সে বক্তব্য থেকে সরে যান। সোমবার রাতে সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দিনের ‘ঠিকানা’ টকশোতে যোগ দিয়ে বিষয়টি নিয়ে তিনি ফের বিস্ফোরক বক্তব্য দেন এবং সরকারের উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ ছোড়েন। টকশোতে সালমান যে ভঙ্গিতে কথা বলেছেন, তা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত নানা রকম কাগজপত্র ও তথ্য তাঁর হাতে আছে। পাশাপাশি বিএনপির বিরুদ্ধে তিনি কঠোর মন্তব্য করেন, সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিজের পরিশ্রমেই তিনি অর্থ উপার্জন করেছেন এবং তাঁর সব অর্থই বৈধ। তিনি বাংলাদেশে থাকবেন না বলেও জানিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—একই ঘটনা নিয়ে সালমান ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন কথা বলছেন কেন? শুরুতে বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে পরে তিনি কেন সে অবস্থান বদলালেন? আবার সর্বশেষ টকশোতে এতটা দৃঢ় অবস্থানই বা কেন নিলেন? অনেকে মনে করছেন, এসব প্রশ্নের জবাব পেতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার। সালমান নিজেও বলেছেন, তদন্তের স্বার্থে সরকার চাইলে তাঁকে তলব করতে পারে। তাঁর বক্তব্যের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য, নথি কিংবা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে কি না, তদন্তের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কেননা যাচাই ছাড়া লাখো মানুষের সামনে কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলা হলে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষত ক্ষমতায় আসার মাত্র সাত মাসের মধ্যে বিএনপির বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগের নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা-ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক তদন্ত এবং ঘটনাটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে সালমান মুক্তাদিরকে জিজ্ঞাসাবাদের কয়েকটি কারণ উঠে আসে। শুরুতেই যাচাই করা প্রয়োজন, সালমান মুক্তাদির যে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলেছেন, তার ভিত্তি কী এবং এর সপক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা প্রমাণ তাঁর কাছে আছে কি না। হামলার পর ফেসবুক লাইভে সালমানের দাবি ছিল, বিএনপির নাম ব্যবহার করে তাঁর কাছে চাঁদা চাওয়া হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, চাঁদা না দেওয়ায়ই তাঁর স্টুডিওতে হামলা হয়। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, সালমানের বক্তব্য অনুযায়ী কেউ তাঁর কাছে সরাসরি চাঁদা দাবি করেনি এবং চাঁদা চাওয়া হলে তিনি তা দিয়ে দিতেন বলেও তিনি জানিয়েছেন। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে একাধিক ব্যক্তিকে। ফলে একই ঘটনা নিয়ে কেন ভিন্ন ধরনের বক্তব্য সামনে এল, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। প্রশাসন তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে চাইতে পারে—কোন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনেছিলেন, তথ্যটি কার কাছ থেকে পেয়েছিলেন এবং অভিযোগের সপক্ষে তাঁর কাছে কী ধরনের প্রমাণ আছে। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো হামলার পেছনের আসল কারণ নির্ণয় করা। পুলিশ ও প্রশাসনের প্রাথমিক তদন্তে এ পর্যন্ত যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে ধারণা করা হচ্ছে, হামলাটি মূলত সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওকে লক্ষ্য করে হয়নি। ঢাকার ইসিবি চত্বরের পাশের ওই জমি নিয়ে আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিউ গিনি প্রপার্টিজ এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। জমির মালিকানা ও চলাচলের রাস্তা নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও সামনে এসেছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, এই বিরোধের জেরেই আবাসন প্রকল্পে হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ওই হামলার সময় প্রকল্প এলাকায় থাকা সালমানের টিনশেড স্টুডিওটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে এখানে আরও কয়েকটি প্রশ্নের জবাব দরকার। বিতর্কিত জমিতে স্টুডিও নির্মাণের আগে সালমান মুক্তাদির জমি ও মালিকানা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করেছিলেন কি না, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিরোধের কথা তাঁর জানা ছিল কি না এবং কোনো পক্ষ নিজেদের স্বার্থে তাঁকে ব্যবহার করছিল কি না—তদন্তে এসব বিষয়ও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তৃতীয়ত, মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া ঘিরেও যে প্রশ্ন উঠেছে, তার জবাব দরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুরুতে বলেছিলেন, সালমান মুক্তাদির বিষয়টি নিয়ে সমাজমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা করলেও থানায় সুনির্দিষ্ট কোনো মামলা করেননি। এর বিপরীতে সালমানের দাবি, হামলার রাতেই তিনি ভোররাত পর্যন্ত থানায় থেকে মামলা করার আবেদন করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ শুরুতে মামলা নেয়নি। মন্ত্রীর বক্তব্যের পর মামলাটি গ্রহণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে ঘটনার রাতে থানায় প্রকৃতপক্ষে কী হয়েছিল, সালমান কখন থানায় যান, কী অভিযোগ করেন এবং এজাহারে কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও অভিযোগের উল্লেখ ছিল—তদন্তের মাধ্যমে এসব বিষয় নিশ্চিত হওয়া দরকার। তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে থানার নথি, মামলা দায়েরের সময় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য মিলিয়ে দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে। চতুর্থত, সমাজমাধ্যমে সালমান মুক্তাদির যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার প্রভাবও বিবেচনায় আনা দরকার। তিনি একজন প্রভাবশালী সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, তাঁর অনুসারীর সংখ্যাও বিপুল। ফলে খুব কম সময়ের মধ্যেই তাঁর বক্তব্য বড় একটি জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে যায়। এ কারণে তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে তাঁকে সমাজমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার ব্যাপারে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সালমানের বক্তব্যের ফলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিংবা রাজনৈতিক পরিবেশে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা দরকার। একই সঙ্গে কোনো তথ্য যথাযথভাবে যাচাই না করেই তিনি প্রচার করেছেন কি না, করে থাকলে এর কারণ কী—সেটিও তদন্তের বিষয় হতে পারে। তবে এ কথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে এ ঘটনায় সালমান মুক্তাদির একজন ভুক্তভোগী। হামলা হয়েছে তাঁর স্টুডিওতে, মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সামগ্রী ভাঙচুর ও লুটের অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগী হিসেবে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার তাঁর অবশ্যই আছে। কিন্তু পাশাপাশি ঘটনাটি নিয়ে তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্য, রাজনৈতিক অভিযোগ এবং হামলার নেপথ্যের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনের স্বার্থে তদন্তকারী সংস্থা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তা তদন্তপ্রক্রিয়ারই অংশ হতে পারে। তিনি কোনো তৃতীয় পক্ষের হয়ে কাজ করেছেন কি না, অথবা অন্য কোনো পক্ষ নিজেদের স্বার্থে তাঁর বক্তব্য বা অবস্থানকে কাজে লাগিয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের জবাবও তদন্তের মাধ্যমেই মিলতে পারে। এদিকে সালমান মুক্তাদিরের অর্থের উৎস নিয়েও অনুসন্ধান চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্টেলিজেন্স বিভাগ তাঁর ব্যাংক হিসাব, অ্যাকাউন্ট খোলার কাগজপত্র ও লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করছে। সালমানের দাবি অবশ্য, তাঁর সব অর্থই বৈধ ও সাদা। এর বাইরে শুল্কমুক্ত মদ রাখার অভিযোগে তাঁর শ্বশুর শেখ নূর ইসলামের ব্যবসার কয়েকটি গুদাম সিল করে দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে সালমান ও তাঁর শ্বশুর দুজনেরই দাবি, তাঁদের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক নেই। সব মিলিয়ে সালমান মুক্তাদিরকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা এখন কেবল একটি হামলার তদন্তে সীমিত নেই। তাঁর অভিযোগের ভিত্তি, বক্তব্য বদল, জমি ও রাস্তা নিয়ে বিরোধ, মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া, সমাজমাধ্যমে তাঁর বক্তব্যের প্রভাব এবং অর্থনৈতিক বিষয়—প্রতিটি দিকই একটি আরেকটির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। সে কারণে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তা কেবল কোনো রাজনৈতিক অভিযোগের জেরে নেওয়া পদক্ষেপ হিসেবে না দেখে গোটা ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তাঁর হাতে থাকা নথি, তথ্য ও বক্তব্য তদন্তের অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। এতে একদিকে হামলার আসল কারণ স্পষ্ট হতে পারে, অন্যদিকে তাঁর তোলা রাজনৈতিক অভিযোগের ভিত্তিও পরিষ্কার হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ