০৮ অক্টোবর ২০২৬ , ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

কক্সবাজারে অগ্রযাত্রা'র আয়োজনে দুর্যোগের আগাম প্রস্তুতিতে নারী নেতৃত্ব শক্তিশালী করার উদ্যোগ

আপলোড সময় : ০৮-১০-২০২৬
কক্সবাজারে অগ্রযাত্রা'র আয়োজনে দুর্যোগের আগাম প্রস্তুতিতে নারী নেতৃত্ব শক্তিশালী করার উদ্যোগ সংগৃহীত ছবি

এস.এম.হুমায়ুন কবির,কক্সবাজার ব্যুরোচীফ : ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসসহ বহুমাত্রিক দুর্যোগঝুঁকিতে থাকা কক্সবাজারে দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই কমিউনিটিকে প্রস্তুত করা এবং সেই প্রস্তুতিতে নারীদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির প্রতিনিধি, উন্নয়ন সংস্থা এবং স্থানীয় কমিউনিটির প্রতিনিধিরা।

৭ অক্টোবর বুধবার কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে অগ্রযাত্রা আয়োজিত “বহু-অংশীজন সমন্বয় ও কমিউনিটি সংলাপ সভা”-য় বক্তারা এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাহামিনা আক্তার।

বাংলাদেশের উপকূলীয় জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, উপকূলীয় ভাঙন ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মুখোমুখি। কক্সবাজারে এসব ঝুঁকির সঙ্গে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার মতো বহুমাত্রিক দুর্যোগও যুক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বঙ্গোপসাগরে একের পর এক শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হওয়ায় উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য আগাম সতর্কতা, আগাম প্রস্তুতি এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ও সমন্বিত সাড়াদানের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

এই বাস্তবতায় কক্সবাজার সদর উপজেলার দুর্যোগ ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ চৌফলদণ্ডী ও খুরুশকুল ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে অগ্রযাত্রা একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। উদ্যোগটির মূল উদ্দেশ্য হলো—দুর্যোগের সময় নারীদের শুধু সহায়তা গ্রহণকারী হিসেবে নয়, বরং আগাম প্রস্তুতি, পরিবার ও প্রতিবেশীর নিরাপত্তা, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সহায়তা এবং কমিউনিটি পর্যায়ের সাড়াদানে সক্রিয় অংশীদার ও স্থানীয় নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

Oxfam in Bangladesh-এর সহযোগিতায় SHIFT Asia / FLHL Humanitarian Action Fund-এর আওতায় অগ্রযাত্রা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পের আওতায় চৌফলদণ্ডী ও খুরুশকুলে ১০টি নারী আগাম পদক্ষেপ দল (WAAG)-এর মাধ্যমে ২০০ নারীকে দুর্যোগের আগাম সতর্কতা, ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ, আগাম পদক্ষেপ, পরিবার ও কমিউনিটি প্রস্তুতি এবং জবাবদিহিতা বিষয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৬টি নারী-নেতৃত্বাধীন দ্রুত সাড়াদান দল (WRRT), কমিউনিটি নারী মতামত ও জবাবদিহিতা ব্যবস্থা, ব্যবহারিক মহড়া এবং স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদারের কার্যক্রম চলছে।

সভায় স্বাগত বক্তব্যে অগ্রযাত্রার পরিচালক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, দুর্যোগের সময় নারীরা পরিবার ও কমিউনিটির প্রথম সাড়াদানকারীদের অন্যতম। সন্তান, বয়স্ক সদস্য, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, খাবার-পানি ও প্রতিবেশীর নিরাপত্তার বিষয়গুলোতে নারীরা বাস্তব জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বলেন, “প্রয়োজন হলো এই অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে আরও সংগঠিত করা, প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও প্রস্তুতি বাড়ানো এবং বিদ্যমান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা।”
তিনি আরও বলেন, প্রশিক্ষিত নারী দলগুলোকে সিপিপি, ইউনিয়ন পরিষদ, ইউনিয়ন ও উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং স্থানীয় প্রশাসনের বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে কমিউনিটি পর্যায়ে সেই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। এরপর প্রকল্প সমন্বয়কারী আবির আহমেদ প্রকল্পের উদ্দেশ্য, কার্যক্রম, মাঠপর্যায়ের অগ্রগতি, নারী দলগুলোর। 

ভূমিকা, দুর্যোগ প্রস্তুতির সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। সভা পরিচালনা করেন অগ্রযাত্রার ডেপুটি ডিরেক্টর শহীদ সেলিম। সভায় উন্মুক্ত আলোচনায় সাবেক উপজেলা সিপিপি টিম লিডার মোহাম্মদ হোসেন নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ প্রতিনিধিদের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি অগ্রযাত্রার প্রশিক্ষিত ২০০ জন তৃণমূল নারীকে সিপিপির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

কমিউনিটির নারী প্রতিনিধিরা দুর্যোগের সময় গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধী নারীদের বিশেষ সহায়তা, আশ্রয়কেন্দ্রে নারীবান্ধব স্যানিটেশন এবং নারী স্বেচ্ছাসেবকদের ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

রেড ক্রিসেন্ট ও অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা স্থানীয় নারী ও স্বেচ্ছাসেবকদের অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলা, প্রাথমিক চিকিৎসা, দুর্যোগ বিষয়ক স্থায়ী আদেশ এবং ব্যবহারিক মহড়া বিষয়ে আরও দক্ষ করে তোলার পরামর্শ দেন।

আলোচনায় অংশগ্রহণকারী সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, সিপিপি, উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিরা তৃণমূল নারীদের দুর্যোগের আগাম প্রস্তুতি ও স্থানীয় সাড়াদান ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার অগ্রযাত্রার উদ্যোগকে সময়োপযোগী, বাস্তবভিত্তিক ও সম্ভাবনাময় বলে অভিহিত করেন। তাঁরা প্রকল্পটির কার্যকর বাস্তবায়ন, সরকারি কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় এবং প্রশিক্ষিত নারী দলগুলোর সক্ষমতা ভবিষ্যতেও কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

সভাপতির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাহামিনা আক্তার অগ্রযাত্রার উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, তৃণমূলের নারীদের জলবায়ু ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সচেতন, প্রস্তুত ও নেতৃত্বশীল করে তোলা হলে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। তিনি প্রশিক্ষিত নারীদের সঙ্গে সিপিপি ও ইউনিয়ন পরিষদের কার্যকর সংযোগ তৈরিসহ প্রকল্প বাস্তবায়নে উপজেলা প্রশাসনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

সভায় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাসেল রানা, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কৌশিক খান, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আশিষ চন্দ্র পাল, সাবেক উপজেলা সিপিপি টিম লিডার মোহাম্মদ হোসেন, খুরুশকুল ইউনিয়ন পরিষদের মহিলা সদস্য অর্চনা প্রভা দে, চৌফলদণ্ডী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আমানুল হক, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি এবং চৌফলদণ্ডী ও খুরুশকুলের নারী ও কমিউনিটি প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

অগ্রযাত্রা জানিয়েছে, এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ প্রদান নয়। বরং প্রশিক্ষিত নারীদের সক্ষমতা, কমিউনিটি পর্যায়ের প্রস্তুতি ব্যবস্থা এবং নারী-নেতৃত্বাধীন WAAG ও WRRT দলগুলোকে বিদ্যমান সরকারি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত রেখে একটি কার্যকর, স্থানীয় মালিকানাভিত্তিক ও টেকসই দুর্যোগ প্রস্তুতি মডেল গড়ে তোলা।

অগ্রযাত্রার প্রত্যাশা—প্রকল্পের মাধ্যমে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা ভবিষ্যতে কক্সবাজারের অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় কমিউনিটিতেও প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করবে।
 “দুর্যোগের পর শুধু সাড়া নয়—দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতি; আর সেই প্রস্তুতিতে নারীর নেতৃত্ব।”


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ