পারস্পরিক সম্মতি ছাড়া লেনদেন নয়, বলছে কোরআন
মানবজাতির হেদায়েতের মূল উৎস পবিত্র কোরআন। মানুষের ইহকাল ও পরকালের কল্যাণে যা প্রয়োজন, সে বিষয়ে নানা দিকনির্দেশনা এতে দেওয়া আছে। ফলে কোরআনের শিক্ষা কেবল ইবাদত-বন্দেগি বা পরকালীন জীবনের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়; দৈনন্দিন জীবনযাপন, সামাজিক সম্পর্ক, অর্থনীতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়েও এতে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা এসেছে।
ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্যকে মানুষের বৈধ রোজগারের অন্যতম উপায় হিসেবে দেখে। তবে সে রোজগার হতে হবে ন্যায়, সততা ও পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এবং আল্লাহর বিধান অনুসরণ করে। ব্যবসায়িক কার্যক্রমের কারণে যাতে মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন না হয় এবং তা দ্বিন পালনে অন্তরায় হয়ে না ওঠে—এ ব্যাপারেও কোরআন বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়েছে।
কোরআনের ভাষায় ব্যবসা-বাণিজ্য
ব্যবসা-বাণিজ্য বোঝানোর জন্য পবিত্র কোরআনে মূলত ‘তিজারা’ শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়। পাশাপাশি ‘বাই’, যার অর্থ বেচাকেনা বা লেনদেন, এবং ‘শিরা’, যার অর্থ ক্রয় করা—এ শব্দগুলো দিয়েও আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
চারটি সুরার ছয়টি স্থানে মোট আটটি আয়াতে ‘তিজারা’ শব্দটি কোরআনে এসেছে। এর পাঁচটি আয়াত রয়েছে সুরা বাকারায়। অপরদিকে সাতটি সুরায় চারটি স্থানে মোট ১৯ আয়াতে ‘বাই’ ও ‘শিরা’ শব্দ দুটির ব্যবহার রয়েছে। এ শব্দগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে সুরা বাকারায়।
ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ে কোরআনের গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা
১. বৈধ উপার্জনের পথ ব্যবসা-বাণিজ্য
বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যকে ইসলাম অনুমোদন দিয়েছে। পাশাপাশি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সুদকে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
‘যারা সুদ খায় তারা সেই ব্যক্তিরই মতো দাঁড়াবে, যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে। এটা এ জন্য যে তারা বলে, ক্রয়-বিক্রয় তো সুদের মতো। অথচ আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন।’
—সুরা বাকারাহ, আয়াত ২৭৫
অর্থাৎ ব্যবসা ইসলামে বৈধ; তবে তা হতে হবে শরিয়ত অনুযায়ী এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে।
২. লেনদেনে দুই পক্ষেরই সম্মতি থাকা চাই
অন্যায় পন্থায় কারও সম্পদ নিয়ে নেওয়া ইসলাম বৈধ মনে করে না। ব্যবসায়িক লেনদেনে ক্রেতা ও বিক্রেতা—দুজনেরই স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি থাকা আবশ্যক। আল্লাহ বলেন—
‘হে মুমিনরা! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না; কিন্তু তোমাদের পরস্পর রাজি হয়ে ব্যবসা করা বৈধ।’
—সুরা নিসা, আয়াত ২৯
সুতরাং প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে, ভয় দেখিয়ে, চাপ দিয়ে অথবা অন্যায় প্রভাব খাটিয়ে করা কোনো লেনদেন ইসলামের নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
৩. ঋণ ও আর্থিক লেনদেন লিখে রাখাই উত্তম
ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং ভবিষ্যতের বিরোধ এড়াতে লেনদেন লিখিত আকারে রাখার বিষয়ে কোরআন গুরুত্বারোপ করেছে। বিশেষত নির্দিষ্ট মেয়াদের ঋণ বা পাওনা থাকলে তা লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
‘হে মুমিনরা! তোমরা যখন একে অন্যের সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের জন্য ঋণের কারবার করো, তখন তা লিখিয়ে রেখো। তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক যেন ন্যায্যভাবে লিখে দেয়।’
—সুরা বাকারাহ, আয়াত ২৮২
ব্যবসায়িক লেনদেনে দলিল, হিসাব ও স্বচ্ছতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই নির্দেশ থেকে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৪. বেশি মুনাফার লোভে প্রতারণা নয়
ব্যবসায় মুনাফা করা বৈধ। কিন্তু বাড়তি লাভের লোভে মানুষকে ঠকানো, ওজনে কম দেওয়া বা পণ্যের ব্যাপারে অসততার আশ্রয় নেওয়াকে ইসলাম কঠোরভাবে নিন্দা করেছে।
আল্লাহ বলেন—
‘দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যারা লোকের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাদের জন্য মেপে বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।’
—সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত ১-৪
অতএব একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর কাছে লাভের তুলনায় সততা ও ন্যায়পরায়ণতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
৫. জীবিকার খোঁজে দেশ-বিদেশে সফর বৈধ
জীবিকা উপার্জনের জন্য ভ্রমণ করা ও ব্যবসা করাকে কোরআন নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেনি। বরং আল্লাহর অনুগ্রহ বা জীবিকার অনুসন্ধানে সফরের প্রসঙ্গ কোরআনে উল্লেখ আছে।
আল্লাহ বলেন—
‘আল্লাহ জানেন যে তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়বে, কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) সন্ধানে দেশভ্রমণ করবে এবং কেউ কেউ আল্লাহর পথে সংগ্রামে লিপ্ত হবে।’
—সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত ২০
আলেমদের ব্যাখ্যা অনুসারে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে দ্বিনি জ্ঞান অর্জনের জন্য যে সফর, সেটিই সর্বোত্তম; এরপর রয়েছে ঈমান রক্ষার্থে হিজরত, আর জীবিকার খোঁজে করা সফরও গুরুত্বপূর্ণ।
৬. কোরআনে নৌ-বাণিজ্যের গুরুত্বের কথাও আছে
সমুদ্রপথে বাণিজ্য করা ও জীবিকা অনুসন্ধানের প্রসঙ্গও কোরআনে স্থান পেয়েছে। আল্লাহ বলেন—
‘তোমরা দেখো তার (সমুদ্রের) বুক চিরে নৌযান চলাচল করে, যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ (জীবিকা) অনুসন্ধান করতে পারো এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’
—সুরা ফাতির, আয়াত ১২
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমুদ্র ও নৌপথও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৭. ব্যবসায় সময় ও মৌসুম গুরুত্বপূর্ণ
ব্যবসায় উপযুক্ত সময় এবং বাজারের চাহিদা সম্পর্কে সজাগ থাকা অত্যন্ত জরুরি। কুরাইশদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্য সফরের কথা কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে—
‘যেহেতু কুরাইশের আসক্তি আছে, আসক্তি আছে তাদের শীত ও গ্রীষ্মের সফরের।’
—সুরা কুরাইশ, আয়াত ১-২
তাফসিরবিদরা বলেন, ব্যবসার উদ্দেশ্যে কুরাইশরা শীতকালে ইয়েমেনে এবং গ্রীষ্মকালে শাম অঞ্চলে যাতায়াত করত। অর্থাৎ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সময়, স্থান ও মৌসুমের উপযোগিতা বুঝে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবসা-বাণিজ্য ও দ্বিনদারির ভারসাম্য
ব্যবসা-বাণিজ্যকে বৈধ ঘোষণা করার পাশাপাশি ইসলাম শিক্ষা দিয়েছে, মুমিনের জীবনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দ্বিনদারির মধ্যে যেন ভারসাম্য থাকে। ব্যবসা যাতে মানুষকে ঈমান, ইবাদত ও আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে ঠেলে না দেয়—সে বিষয়ে কোরআনের নির্দেশনা সুস্পষ্ট।
১. ঈমান ও নেক আমলও একপ্রকার সফল ‘ব্যবসা’
ঈমান ও আল্লাহর পথে আত্মত্যাগকে কোরআনে ব্যবসার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন—
‘হে মুমিনরা! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দেব যা তোমাদেরকে রক্ষা করবে মর্মন্তুদ শাস্তি থেকে; তা এই যে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করবে।’
—সুরা সাফ, আয়াত ১০-১১
অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাই প্রকৃত মুমিনের সবচেয়ে বড় লাভ।
২. বৈধ ব্যবসা ও ইবাদত একসঙ্গে চলতে পারে
ইসলামের বিধান পালনে ব্যবসা যদি অন্তরায় না হয়, তবে ব্যবসার পাশাপাশি ইবাদত ও দ্বিনি দায়িত্ব পালন করা পুরোপুরি বৈধ। আল্লাহ বলেন—
‘তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ সন্ধান করাতে তোমাদের কোনো পাপ নেই।’
—সুরা বাকারাহ, আয়াত ১৯৮
ইমাম কুরতুবি (রহ.)-এর তাফসিরে ‘আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান’-এর অর্থের মধ্যে ব্যবসাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ হজের মতো ইবাদতের সময়েও বৈধ ব্যবসা করার সুযোগ ইসলাম রেখেছে।
৩. ব্যবসা যেন ইবাদতের পথে অন্তরায় না হয়
ব্যবসা করা বৈধ, তবে ব্যবসার কারণে নামাজ, আল্লাহর স্মরণ বা অন্যান্য দ্বিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যবসা ও বিনোদনের কারণে যারা আল্লাহর স্মরণ থেকে সরে যায়, কোরআনে তাদের সতর্ক করা হয়েছে।
আল্লাহ বলেন—
‘যখন তারা দেখল ব্যবসায় ও কৌতুক, তখন তারা তোমাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে তার দিকে ছুটে গেল। বোলো, আল্লাহর কাছে যা আছে তা ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যবসা অপেক্ষা উত্তম।’
—সুরা জুমা, আয়াত ১১
৪. ব্যবসার চেয়ে দ্বিনের দায়িত্ব অগ্রাধিকার পাবে
ব্যবসা যত গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন, আল্লাহর ফরজ নির্দেশের সঙ্গে ব্যবসার সংঘাত দেখা দিলে দ্বিনকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। জুমার নামাজের আহ্বানের সময় ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন—
‘হে মুমিনরা! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কোরো, এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি করো।’
—সুরা জুমা, আয়াত ৯
ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসা কেবল অর্থ রোজগারের একটি উপায় নয়; এটি সততা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা এবং মানুষের অধিকার রক্ষারও একটি ক্ষেত্র। বৈধ পথে অর্জিত সম্পদ যেভাবে মানুষের পার্থিব জীবনকে সমৃদ্ধ করে, সেভাবেই আল্লাহর বিধান মেনে পরিচালিত ব্যবসা মুমিনের জন্য সওয়াবের কারণও হতে পারে।
তাই হালাল উপার্জন, সৎ লেনদেন, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং ব্যবসার পাশাপাশি আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব পালন—এগুলোই হওয়া উচিত একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর লক্ষ্য। কোরআনের এ শিক্ষা ব্যক্তি, সমাজ ও অর্থনীতিতে ন্যায়ভিত্তিক একটি সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।
কমেন্ট বক্স