ছবিঃ সংগৃহীত
আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের (আফকন) ফাইনালে মরক্কোকে হারিয়েও চ্যাম্পিয়নের স্বীকৃতি পায়নি সেনেগাল। একটি বিতর্কিত পেনাল্টি, খেলোয়াড়দের মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়া এবং আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের (সিএএফ) রায়—সব মিলিয়ে ফুটবলের সাম্প্রতিক আলোচিত এই বিতর্ক এবার গড়িয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) দুই দলের শিরোপা বিতর্কের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন অপেক্ষা আদালতের চূড়ান্ত রায়ের।
বার্তা এপি ও রয়টার্স জানিয়েছে, সেনেগালের আপিলের শুনানি হয়েছে সুইজারল্যান্ডের লুজানে অবস্থিত ক্রীড়া সালিশি আদালতে (সিএএস)। রুদ্ধদ্বার এই শুনানিতে তিন বিচারকের প্যানেল দুই পক্ষের বক্তব্য শুনেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন আদালত।
পেনাল্টি থেকে বিতর্কের সূত্রপাত গত ১৮ জানুয়ারি মরক্কোর রাজধানী রাবাতে অনুষ্ঠিত হয় আফকনের ফাইনাল। সেনেগালের বিপক্ষে সেই ম্যাচে নির্ধারিত সময়ের একেবারে শেষ দিকে স্বাগতিক মরক্কোকে পেনাল্টি দেন কঙ্গোর রেফারি জ্যঁ-জ্যাক এনদালা। পেনাল্টির সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে মাঠ ছেড়ে চলে যান সেনেগালের খেলোয়াড়েরা।
প্রায় ১৫ মিনিট খেলা বন্ধ থাকে। গ্যালারিতেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। গুমোট পরিস্থিতির একপর্যায়ে সেনেগালের সমর্থকদের সঙ্গে মরক্কোর পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
এমন পরিস্থিতিতে ম্যাচ পরিত্যক্ত হলে মরক্কোকে জয়ী ঘোষণা করার সুযোগ তৈরি হতো। তবে সেনেগালের তারকা ফরোয়ার্ড সাদিও মানে সতীর্থদের মাঠে ফিরে খেলা শেষ করতে রাজি করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
খেলা আবার শুরু হলে পেনাল্টি নেওয়ার সুযোগ পান মরক্কোর ব্রাহিম দিয়াজ। রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড সেনেগালের গোলকিপার এদুয়া মেন্দিকে বোকা বানাতে ধীরগতির চিপ শট নেন। কিন্তু মেন্দি জায়গায় দাঁড়িয়ে সহজেই বলটি ধরে ফেলেন।
এরপর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের চতুর্থ মিনিটে সেনেগালের মিডফিল্ডার পাপে গেয়ের জোরালো শটে গোল পায় দলটি। শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হয়ে মাঠ ছাড়ে সেনেগাল।
সিএএফের সিদ্ধান্তে কেড়ে নেওয়া হয় ট্রফি ফাইনালের পর দুই দলের খেলোয়াড়, সেনেগালের কোচ পাপে থিয়াও এবং সংশ্লিষ্ট ফুটবল ফেডারেশনগুলোর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ১০ লাখ ডলারের বেশি জরিমানা করে সিএএফের শৃঙ্খলাবিষয়ক বিচারক প্যানেল। ম্যাচের ১১ দিন পর এই জরিমানার সিদ্ধান্ত আসে। তবে সেই সময় ফাইনালের ফল বাতিল করে মরক্কোকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণার আবেদন খারিজ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিষয়টি সিএএফের আপিল বোর্ডে গড়ায়।
গত মার্চে বোর্ড সেনেগালের মাঠ ছেড়ে যাওয়ার ঘটনাকে প্রতিযোগিতার নিয়ম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে। তাদের সিদ্ধান্তে ফাইনালের ফল ১-০ থেকে পরিবর্তন করে মরক্কোর পক্ষে ৩-০ ঘোষণা করা হয়। এর ফলে সেনেগালের ট্রফি চলে যায় মরক্কোর হাতে। সিএএফের টুর্নামেন্টের বিধিতে বলা হয়েছে, কোনো দল রেফারির অনুমতি ছাড়া খেলা শেষ হওয়ার আগে মাঠ ছেড়ে চলে গেলে বা খেলতে অস্বীকৃতি জানালে সেই দলকে পরাজিত গণ্য করা হবে এবং চলমান প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়া হবে।
এই বিধির ভিত্তিতেই সেনেগালকে পরাজিত বিবেচনা করে মরক্কোকে চ্যাম্পিয়ন করা হয়। তবে এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি সেনেগাল।
সেনেগালের আইনি পদক্ষেপের ঘোষণা শিরোপা হারানোর পর সেনেগাল সরকার ঘোষণা দেয়, ট্রফি পুনরুদ্ধারে তারা সব উপযুক্ত আইনি পথ অনুসরণে ফেডারেশনকে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে আফ্রিকান ফুটবলের ভেতরে দুর্নীতির সন্দেহ নিয়ে তদন্তেরও আহ্বান জানায় সরকার।
ঘটনাটি আফ্রিকান ফুটবলের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে ২০৩০ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক মরক্কোর সিএএফ ও ফিফার ওপর প্রভাব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে মরক্কোর প্রভাবসংক্রান্ত অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এদিকে, রাবাতের ফাইনাল ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনায় কারাবন্দী হওয়া সেনেগালের ১৮ সমর্থককে গত মে মাসে ক্ষমা করেন মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ।
রুদ্ধদ্বার শুনানি, এবার চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা সেনেগাল ফুটবল ফেডারেশন সিএএফের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্রীড়া সালিশি আদালতে আপিল করে। গতকাল লুজানে অনুষ্ঠিত শুনানিতে দুই পক্ষের আইনি প্রতিনিধিরা নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন।
শুনানিতে সেনেগাল ও মরক্কোর ফুটবল ফেডারেশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে আগে অনিশ্চয়তা ছিল। একই সময়ে কেপ ভার্দেতে সিএএফের তিন দিনের ফুটবল সম্মেলন চলছিল, যেখানে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোও অংশ নেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিএএসের মহাপরিচালক ম্যাথিউ রিব শুনানির পর জানান, আদালত দ্রুত সিদ্ধান্ত দিতে চান। তার ভাষ্য, ‘শুনানির পরপরই কিংবা পরদিন রায় আসবে না। তবে কয়েক দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করা হচ্ছে।’
আদালতের রায়ে সেনেগালের আপিল গ্রহণ করা হলে শিরোপা নিয়ে সিএএফের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার পথ তৈরি হবে। আর মরক্কোর পক্ষে আগের সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে দেশটির চ্যাম্পিয়ন স্বীকৃতি বজায় থাকবে।
২০২৭ সালের জুনে কেনিয়া, তানজানিয়া ও উগান্ডার যৌথ আয়োজনে পরবর্তী আফকন শুরু হওয়ার কথা। তার আগে এই মামলার রায় আফ্রিকান ফুটবলের শিরোপা বিতর্কের নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মাঠের ৯০ মিনিট ও অতিরিক্ত সময়ের লড়াই শেষ হলেও সেনেগাল-মরক্কোর শিরোপা সংঘাত এখনো শেষ হয়নি। এবার সেই লড়াইয়ের নিষ্পত্তি ফুটবলের মাঠে নয়, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে হবে।