ছবিঃ সংগৃহীত
রিয়াজুল হক: নামসর্বস্ব, অনুমোদনহীন একটি প্রতিষ্ঠান থেকে খবর পেলেন— ‘প্রতি লাখ টাকায় মাসে চার হাজার টাকা লাভ দেওয়া হচ্ছে!’?
এই লোভনীয় প্রস্তাব শুনে আপনি প্রথমে খানিকটা সন্দেহ করলেও, মনে মনে ভাবলেন— ‘এক লাখ টাকা দিলে আর এমন কী! দেখি কী হয়! ব্যাংকে টাকা রাখলে ৮০০/৯০০ টাকার বেশি পাওয়া যাবেনা না।’
আপনি প্রথমে এক লাখ টাকা সেখানে জমা দিলেন। প্রথম মাসেই লাখ টাকার বিপরীতে চার হাজার টাকা পেলেন। দ্বিতীয় মাসেও পেলেন একই পরিমাণ। তৃতীয় মাসেও।
আপনি খুশিতে আত্মহারা। কারণ এমন লাভ তো কেউ দেয় না! ভেবে নিলেন, এ যেন ভাগ্য পরিবর্তনের কেবল সূচনা মাত্র।
লাভের পরিমাণ বেশি পাবার আশায়, অন্যান্য জায়গায় যেসব টাকা জমা রাখা ছিল, সেখান থেকে সব এনে ১০ লাখ টাকা জমা দিলেন। পরের মাসে চল্লিশ হাজার টাকা লাভ পেলেন। তারপরের মাসে আবার চল্লিশ হাজার টাকা। কি শান্তি! অটোমেটিক টাকা আসে। পুরো সংসারের খরচ হয়ে যাচ্ছে। আবার কিছু টাকাও হাতে থেকে যাচ্ছে। বেতনের টাকায় হাত দেওয়া লাগছে না।
কয়েকমাস পর দেখা গেল, হঠাৎ সেই প্রতিষ্ঠানের দরজায় তালা ঝুলছে। লোকজনের খোঁজ নাই। কেউ আর ফোন ধরছে না।
আপনার তো হাত-পা কাপাকাপি অবস্থা, সাথে বুকফাটা আর্তনাদ। কারণ সঞ্চয় বলতে ওই দশ লাখ টাকাই আপনার সব। এবার আপনি আপনার সেই ১০ লাখ টাকা উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন মানুষ ধরলেন। যাদেরকে ধরলেন, তারাও আবার ধুরন্ধর। টাকা উদ্ধারের কথা বলে আপনার কাছ থেকে কয়েকদিন পরপর দুই/পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া শুরু করল। ছয় মাস পর দেখলেন, এভাবেও লাখ টাকার উপরে হাওয়া হয়ে গেছে। এই হাওয়া হয়ে যাওয়া টাকা কিন্তু আপনি আবার চাইতে পারবেন না। কারণ যাদেরকে টাকা দিয়েছেন, তারা তো আপনার টাকা উদ্ধারের জন্যই বিভিন্ন প্রয়োজনের নাম করে টাকা নিয়েছেন।
এভাবে আপনার সেই ১০ লাখ টাকা উদ্ধার হলো না।
এরপর নতুন কারো পরামর্শে থানায় অভিযোগ দিলেন। আদালতে মামলা করলেন। সেখানেও উকিল খরচ, মামলা খরচ চলতেই থাকলো।
এভাবে মাসের বেতনের একটা অংশ সেই টাকা উদ্ধারের জন্য ব্যয় হতে লাগলো। দিন পেরিয়ে যায়। নিজের কাজকর্ম ফেলে সময়ও নষ্ট হতে থাকলো। আর আপনার দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা, শ্রমের কথা উহ্য রাখলাম।
ধরুন, আপনার মতো আরও পাঁচ হাজার মানুষ? অগাধ লাভের লোভে যে যেভাবে পেরেছে, টাকা জমা রেখেছে।
ফলাফল সবার একই পরিণতি। কারও লাখ টাকা গেছে, কারও কোটি টাকা।
?শেষে সবাই বলছে— ‘আমরা তো সহজ-সরল মানুষ, প্রতারিত হয়েছি!’
কিন্তু সত্যি কি তাই?
সহজ-সরল নাকি অতি লোভী?
প্রতারকেরা চতুর, এতে সন্দেহ নেই। তারা মানুষের লোভ, অজ্ঞানতা এবং সহজে ধনী হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘আমরা কি সত্যিই প্রতারিত হয়েছি, নাকি নিজের লোভের ফাঁদে নিজেরাই আটকা পড়েছি?’
যে প্রস্তাব শুনলেই মনে হয়, ‘এটা তো অসম্ভব’, সেটাই যদি সত্যি বলে বিশ্বাস করি, তাহলে দোষ কার?
লোভ মানুষের প্রকৃত শত্রু। এটা মানুষকে যুক্তিহীন করে তোলে, অন্ধ করে ফেলে। আজকের দিনে যখন প্রতারণা প্রযুক্তির উন্নয়নের মতো দ্রুত বাড়ছে, তখন সচেতন হওয়াই একমাত্র প্রতিরোধ। কারণ, আপনি যদি লোভের ফাঁদে পা বাড়ান, তাহলে যা আছে, তাও হারাতে হবে। সেই অতি লোভে তাঁতি নষ্টের মতো অবস্থা আর কি!?
লেখক: অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।