ছবিঃ সংগৃহীত
কর ব্যবস্থার সংস্কার, অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি কমানো এবং সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও ঋণের চাপ সামাল দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একই সঙ্গে ঢালাও ভর্তুকির পরিবর্তে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। আইএমএফের মতে, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সপ্তাহব্যাপী বৈঠকের তৃতীয় দিনে ‘ফিসক্যাল মনিটর’ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। এতে বক্তব্য দেন আইএমএফের ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস, উপপরিচালক এরা দাবলা-নরিস এবং বিভাগের ডিভিশন চিফ ডেভিডে ফুরচেরি। ব্রিফিংয়ে যোগাযোগ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন থিলেন পাভিস দেবাহাসাদিন।
আইএমএফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং কর প্রশাসনের আধুনিকায়নের মাধ্যমে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর রাজস্ব আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি পর্যালোচনা এবং সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে এসব সংস্কার বাস্তবায়নের সময় নিম্নআয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে কি না, তা বিবেচনায় রাখতে হবে।
সংস্থাটি বলছে, ঢালাও ভর্তুকির বড় অংশ অনেক সময় দরিদ্র মানুষের পরিবর্তে বেশি ভোগক্ষমতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে যায়। এতে সরকারি অর্থের কার্যকারিতা কমে। তাই জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যে নির্বিচারে ভর্তুকি দেওয়ার পরিবর্তে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। তবে ভর্তুকি কমানোর কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
কর প্রশাসন সহজ ও কার্যকর করা গেলে কর আদায়ের ব্যয় এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো সম্ভব বলে মনে করে আইএমএফ। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কর পরিপালনের প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়ক পরিবেশ তৈরি হতে পারে। সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কিছু দেশে কর প্রশাসনের উন্নয়নের মাধ্যমে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২ শতাংশের সমপরিমাণ অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কর সংস্কারের উদাহরণ হিসেবে মিশরের মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থার সংস্কার ও কর অব্যাহতি কমানোর উদ্যোগ তুলে ধরা হয়েছে। আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহার, জ্বালানি কর ব্যবস্থার স্বাভাবিকীকরণ এবং ভর্তুকি পুনর্বিন্যাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, কলম্বিয়াকে রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ব্যয় কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহের অনিশ্চয়তার মধ্যে ভর্তুকি সংস্কারের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে মরক্কোর উদাহরণ তুলে ধরে আইএমএফ বলেছে, দেশটি সর্বজনীন ভর্তুকি ব্যবস্থা থেকে সরে এসে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সরাসরি সামাজিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ভর্তুকি প্রত্যাহার সব দেশের জন্য সহজ সমাধান নয়। নাইজেরিয়ায় জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহারের পর সরকারি রাজস্ব বাড়লেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণ পরিশোধের বড় ব্যয় অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করেছে। দেশটির রাজস্বের প্রায় ৪২ শতাংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হওয়ার বিষয়টিও আর্থিক ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে। ইথিওপিয়াও আইএমএফের কর্মসূচির আওতায় কর বৃদ্ধি ও ভর্তুকি সংস্কারের মতো পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। তবে জ্বালানির দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে ভর্তুকি কমানোর পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম আর্থিক প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছে আইএমএফ। ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে সম্ভাব্য দুর্যোগের ক্ষতি সামাল দিতে আর্থিক সুরক্ষাব্যবস্থা ও জরুরি তহবিল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়ের পরও জ্যামাইকার আগাম অর্থনৈতিক প্রস্তুতিকে ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, ইউরোপে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর চাপ সরকারি বাজেট ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের সুযোগ সীমিত থাকলে প্রতিরক্ষা খাতে অর্থ জোগাতে অন্য খাতের ব্যয় কমানোর প্রয়োজন হতে পারে। এতে সামাজিক সুরক্ষা, উন্নয়ন ও জনসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ নিয়ে নীতিনির্ধারকদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জনসংখ্যার বার্ধক্য পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে। আইএমএফের বিশ্লেষণে ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের আনুষ্ঠানিক কর ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত কমে গেলে পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বাড়তে পারে। একই সময়ে করদাতার সংখ্যা প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনাও কঠিন হয়ে উঠবে।
ঋণ সংকটে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য তারল্য সহায়তা, ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানো এবং ঋণ পুনর্গঠনকেও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করছে আইএমএফ। এ ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা হিসেবে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ সামাল দেওয়ার পাশাপাশি উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করা।
আইএমএফের সুপারিশের মূল কথা হলো, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে শুধু ব্যয় কমানো বা ভর্তুকি প্রত্যাহার যথেষ্ট নয়। বরং রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার এবং দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।