৫০ শয্যার হাসপাতালে জনবল সংকট, ব্যাহত চিকিৎসাসেবা
সংগৃহীত ছবি
মোঃ শরীফ হোসেন, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ): নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও বাড়েনি প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা। ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার পরও হাসপাতালটি চলছে পুরোনো জনবল কাঠামো দিয়ে। সেই কাঠামোর ১৬২টি অনুমোদিত পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ৪০টি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসা সরঞ্জামের অচলাবস্থা, প্রয়োজনীয় ওষুধের স্বল্পতা এবং পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জটিলতা। ফলে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের পড়তে হচ্ছে নানা ভোগান্তিতে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চার বছর আগে সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। ২০২২ সালে উদ্বোধন করা হয় নতুন ভবন। তবে শয্যাসংখ্যা বাড়লেও ৫০ শয্যার উপযোগী জনবল কাঠামো এখনো অনুমোদিত হয়নি। ফলে বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে পুরোনো জনবল দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, উপজেলার প্রায় সাড়ে ৬ লাখ মানুষের সরকারি চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এই হাসপাতাল। প্রতিদিন বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে গড়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। এ ছাড়া উপজেলার চারটি বড় অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের একটি অংশও জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালটির ওপর নির্ভরশীল। বিপুলসংখ্যক রোগীর বিপরীতে সীমিত জনবল থাকায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মচারীকে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
হাসপাতালের ৩১ শয্যার জনবল কাঠামো অনুযায়ী, মোট ১৬২টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১২২ জন। শূন্য রয়েছে ৪০টি পদ।
চিকিৎসকের ৩৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ছয়টি শূন্য। কর্মরত ৩০ জন চিকিৎসকের একজন বর্তমানে প্রেষণে নারায়ণগঞ্জের খানপুর সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। নার্সের ৩৪টি পদের মধ্যে একটি শূন্য রয়েছে। পাশাপাশি তিনজন নার্স ডিএনসিসিতে প্রেষণে কর্মরত। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের ৩৪টি পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে দুটি।
সবচেয়ে বেশি সংকট চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ক্ষেত্রে। এ শ্রেণিতে অনুমোদিত ২৩টি পদের মধ্যে ১৪টিই শূন্য। এতে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য সহায়ক কার্যক্রম পরিচালনায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।জনবল সংকটের পাশাপাশি চিকিৎসা সরঞ্জামের অচলাবস্থাও রোগীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনটি নষ্ট থাকায় এ সেবা বন্ধ রয়েছে। ফলে চিকিৎসকের পরামর্শে আল্ট্রাসনোগ্রাম করাতে রোগীদের হাসপাতালের বাইরে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে। এতে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেও বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে তাঁদের।
দীর্ঘদিন ইসিজি মেশিনও অচল ছিল। তবে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি ইসিজি মেশিন অনুদান হিসেবে দেওয়ার পর সেবাটি আবার চালু হয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
রোগী ও তাঁদের স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতাল থেকে কিছু ওষুধ পাওয়া গেলেও চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব ওষুধ মেলে না। ফলে বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এতে নিম্নআয়ের রোগীদের চিকিৎসার ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।চিকিৎসা নিতে আসা জিয়ান আল ইমরান বলেন, হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মচারী বাড়েনি। ফলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে রোগীদের।রোগীর স্বজন নাসিমা আক্তার জানান, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে। নিম্নআয়ের মানুষের পক্ষে এ ব্যয় বহন করা কঠিন।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবার মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে আগের তুলনায় সরকারি ওষুধের সরবরাহ কমেছে। উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেও রয়েছে জনবল সংকট। ফলে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা না পেয়ে অনেক রোগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসছেন। এতে কেন্দ্রীয় হাসপাতালটির ওপর রোগীর চাপ আরও বাড়ছে।
হাসপাতালটির আরেকটি সমস্যা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। সোনারগাঁ পৌরসভায় বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট ডাম্পিং ব্যবস্থা না থাকায় গত কয়েক মাস ধরে হাসপাতালের বর্জ্য অপসারণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। রোগীদের নিরাপদ চিকিৎসার পরিবেশ নিশ্চিত করতে জনবল সংকটের পাশাপাশি বর্জ্য অপসারণের কার্যকর ব্যবস্থাও জরুরি হয়ে পড়েছে।
সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাসেল আহমেদ বলেন, তিনি হাসপাতালে যোগদানের পর এক মাস ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করছেন।
জনবল সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, “হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে। তবে ৫০ শয্যার জনবল কাঠামো এখনো আইনগতভাবে অনুমোদিত হয়নি। ফলে বর্তমানে ৩১ শয্যার জনবল কাঠামো অনুযায়ীই হাসপাতালের কার্যক্রম চলছে। সেই ৩১ শয্যার জনবল কাঠামোতেও সংকট রয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, জরুরি চিকিৎসা যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং হাসপাতালের সার্বিক পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে ইতোমধ্যে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রায় সাড়ে ৬ লাখ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসা সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ৫০ শয্যার অবকাঠামো চালু হলেও প্রয়োজনীয় জনবল, সচল চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ৫০ শয্যার উপযোগী জনবল কাঠামো অনুমোদন, শূন্য পদ পূরণ, বিকল যন্ত্রপাতি সচল এবং ওষুধ সরবরাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে রোগীদের ভোগান্তি কমানোর পাশাপাশি হাসপাতালের সেবার মানও বাড়ানো সম্ভব হবে।
কমেন্ট বক্স