১৬ অক্টোবর ২০২৬ , ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

কওমি জোটে জট

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ১৬-১০-২০২৬
কওমি জোটে জট ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের কওমি মাদরাসাভিত্তিক শীর্ষ ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি অভিন্ন কাঠামোর নিচে আনার উদ্যোগ নিয়ে শুরু হয়েছিল নতুন রাজনৈতিক জোটের যাত্রা। তবে হেফাজতের আমিরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে শুরু হওয়া এই ঐক্যপ্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত নানা শর্তের বেড়াজালে আটকে গেছে। দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দূরত্ব, কৌশলগত ভিন্নতা এবং বিশেষ কিছু শর্তের কারণে এখনো চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। আগামী ২২ অক্টোবর অনুষ্ঠাতব্য লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকের ওপর নির্ভর করছে এই জোটের ভবিষ্যৎ রূপরেখা।

গত জুলাই মাসে হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ মহিবুল্লাহ বাবুনগরী কওমিপন্থী দলগুলোকে নিয়ে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত দলগুলো হলো-জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদরাসায় দলগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু খসড়া রূপরেখায় থাকা বিভিন্ন ধারা ও শর্ত নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় সেই উদ্যোগ বর্তমানে শ্লথ হয়ে পড়েছে।

আলোচনার টেবিলে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জোটে অন্তর্ভুক্তির শর্ত হিসেবে 'অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকতে না পারার' বাধ্যবাধকতা। খসড়া রূপরেখায় সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কোনো দল ভিন্ন জোটে বহাল থেকে এই নতুন সাত দলীয় জোটে অংশ নিতে পারবে না। কিন্তু এই শর্ত নিয়ে দলগুলোর মধ্যে গভীর মতভেদ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি পক্ষ অন্য কোনো বড় বা সমমনা জোটে যুক্ত রয়েছে, যা নতুন প্রস্তাবিত শর্তের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

শুধুমাত্র জোটে থাকার শর্তই নয়, বরং জোটের ওপর অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ কতটুকু থাকবে, তা নিয়েও অস্বস্তিতে রয়েছে কয়েকটি দল। দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের একটি অংশের দাবি, জোট পরিচালিত হওয়া উচিত সকল সমমনা দলের পারস্পরিক সমান সমন্বয় ও আলোচনার মাধ্যমে; কোনো একক সংগঠনের প্রত্যক্ষ বা একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে নয়। এছাড়া জোটবদ্ধ হওয়ার পর দলগুলোর নিজেদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ও গঠনতান্ত্রিক স্বকৃতি বজায় রাখার দাবিও জোরালোভাবে উত্থাপন করা হয়েছে।

দলগুলোর মধ্যকার এই আলোচনা চলার মধ্যেই আবার তৈরি হয়েছে পারস্পরিক অনাস্থা ও আস্থার সংকট। গত বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু নেতার কটু মন্তব্য ও পোস্ট করাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, একটি মহল সুপরিকল্পিতভাবে এই ঐক্যপ্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করতে চাইছে এবং এমন কিছু পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে যাতে শরিক দলগুলো বাধ্য হয়ে প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ায়। কওমি ঘরানার এই দলগুলোর দীর্ঘদিনের দূরত্ব ও কৌশলগত ব্যবধান রাতারাতি ঘুচিয়ে ফেলা সহজ হচ্ছে না।

সকল জটিলতা ও মতভেদ সত্ত্বেও আলোচনার পথ এখনই বন্ধ হয়ে যায়নি। সংকট নিরসনে আগামী ২২ অক্টোবর রাজধানীর খিলগাঁওয়ের আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম মাদরাসায় লিয়াজোঁ কমিটির পরবর্তী বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। সেখানে প্রতিটি দল থেকে তিনজন এবং হেফাজত থেকে তিনজন প্রতিনিধি অংশ নেবেন। এই বৈঠকে অন্য জোটে সম্পৃক্ততার শর্ত, হেফাজতের ভূমিকা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাসহ অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে। ২২ অক্টোবরের এই বৈঠক থেকেই নির্ধারিত হতে পারে কওমিপন্থী দলগুলো শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে কি না।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ