১৬ অক্টোবর ২০২৬ , ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

চলনবিলে কোটি টাকার শামুক বাণিজ্য, হুমকিতে জলজ জীববৈচিত্র‍্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ১৬-১০-২০২৬
চলনবিলে কোটি টাকার শামুক বাণিজ্য, হুমকিতে জলজ জীববৈচিত্র‍্য ছবিঃ সংগৃহীত

বর্ষার পানি কমতে শুরু করতেই সিরাজগঞ্জের চলনবিলে বেড়েছে শামুক-ঝিনুক সংগ্রহের ব্যস্ততা। জীবিকার তাগিদে ছোট-বড় শতাধিক নৌকা নিয়ে প্রতিদিন বিলের বিভিন্ন অংশে শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করছেন স্থানীয় জেলে ও শ্রমজীবী মানুষ। তাঁদের সংগ্রহ করা শামুক-ঝিনুক যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলার মাছ ও হাঁসের খামারে। বর্ষার তিন থেকে চার মাসে এ বাণিজ্যে লেনদেন হচ্ছে প্রায় কোটি টাকা। এতে দরিদ্র মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থান তৈরি হলেও নির্বিচারে শামুক-ঝিনুক আহরণে চলনবিলের জলজ জীববৈচিত্র‍্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, চলনবিল থেকে প্রতিদিন দুই থেকে তিন টন শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে কৃষিকাজ ও অন্যান্য কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় অনেক দরিদ্র কৃষক ও জেলে পরিবারের জীবিকার অন্যতম অবলম্বন হয়ে উঠেছে এই পেশা। তবে বিপুল পরিমাণ শামুক আহরণে বিলের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর কতটা চাপ পড়ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

চলনবিলের শামুক সংগ্রহকারীদের কাছে এটি শুধু পেশা নয়, মৌসুমি বেকারত্বের মধ্যে টিকে থাকার লড়াইও। বর্ষায় মাঠে কাজ কমে গেলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহায়তায় নৌকা নিয়ে বিলে নামেন তাঁরা। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন জলাশয়ে ঘুরে শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করেন। দিন শেষে বিক্রির টাকা দিয়েই চলে পরিবারের খরচ।

শামুক সংগ্রহকারী শঙ্কর চক্রবর্তী বলেন, বর্ষায় কৃষিকাজ বা অন্য কাজ তেমন থাকে না। তখন সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। পেটের দায়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহায়তা নিয়ে শামুক সংগ্রহের কাজে নেমেছেন তিনি। প্রতিদিন এ কাজ করে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। সেই টাকা দিয়েই কোনো রকমে সংসার চালাতে হয়।

তাড়াশ উপজেলার মাগুড়া বিনোদ ইউনিয়নের কুন্দইল গ্রামের জেলে ও শামুক সংগ্রহকারী পরান মন্ডল, বিজয় ও রফিকুল ইসলাম জানান, ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন জলাশয়ে ঘুরে শামুক সংগ্রহ করেন তাঁরা। মাঠে কাজের সুযোগ কম থাকায় বাধ্য হয়েই এ পেশায় যুক্ত হয়েছেন। দিন শেষে শামুক বিক্রির টাকা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করেও সংসারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।

স্থানীয় আরেক সংগ্রহকারী কাদের মোল্লা বলেন, বর্ষায় চাষাবাদসহ অন্যান্য কাজ বন্ধ থাকায় সংসার চালাতে কষ্ট হয়। এ সময় শামুক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় নৌকা নিয়ে বিলে নামেন তিনি। সারাদিন পরিশ্রম করে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোরকমে সংসার চলে। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান বয়সের ভারে আগের মতো পরিশ্রম করতে না পারা সংগ্রহকারী ইয়াসিন আলীও। তাঁর ভাষ্য, সারাদিন বিলে ঘুরেও আগের মতো বেশি শামুক সংগ্রহ করতে পারেন না। যা পান, তা বিক্রি করেই সংসার চালাতে হয়।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, তাড়াশ উপজেলার চলনবিল-সংলগ্ন হামকুড়িয়া, ঘরগ্রাম, কুন্দইল, কামাড়শোন, মাকড়শোন, নাদোসৈয়দপুর ও মাগুড়া বিনোদসহ প্রায় ২২ থেকে ২৫টি এলাকায় শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করা হচ্ছে। ছোট-বড় শতাধিক নৌকায় প্রতিদিন চলে এ কার্যক্রম। সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত শামুক সংগ্রহের মৌসুম। তবে এবার বর্ষার পানি দেরিতে নামায় সংগ্রহের সময় আরও প্রায় এক মাস বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংগ্রহকারীরা সাধারণত ছোট ডিঙি নৌকা ব্যবহার করেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তাঁদের নৌকা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে থাকেন। একজন সংগ্রহকারী দিনে তিন থেকে চার বস্তা শামুক-ঝিনুক তুলতে পারেন। প্রতি বস্তা বিক্রি হয় ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। সংগ্রহের পরিমাণ ও পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে তাঁদের দৈনিক আয়।

চলনবিলের শামুক-ঝিনুক স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কুষ্টিয়া, নোয়াখালী, বরিশাল, বাগেরহাট, যশোর ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। এসব এলাকার মাছ ও হাঁসের খামারে শামুক খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে চিংড়ি ও পাঙ্গাশ মাছের খাদ্য তৈরিতে সংগৃহীত শামুক ব্যবহার করা হয়।

শামুক বাণিজ্যের সঙ্গে স্থানীয় সংগ্রহকারী ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিক এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকারি ব্যবসায়ীরাও যুক্ত রয়েছেন। সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে শামুক কিনে ব্যবসায়ীরা তা বিভিন্ন আড়তে পাঠান। পরে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে মাছের খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়।

নাদোসৈয়দপুর এলাকার শামুক ব্যবসায়ী আলামিন শেখ, কামাল হোসেন ও লিটন মিয়া জানান, তাঁরা তাড়াশ, নওগাঁ ও পাবনার কয়েকটি ইউনিয়নের সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে শামুক কেনেন। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, কয়েকটি ব্যবসায়ী দল মিলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ মণ শামুক কিনছে। প্রতি কেজি শামুকের ক্রয়মূল্য প্রায় সাত টাকা।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল মমিন বলেন, ছোট-বড় মিলিয়ে ২২ থেকে ২৫ জন ব্যবসায়ী এ কাজে জড়িত। তাঁরা স্থানীয় সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে শামুক কিনে বিভিন্ন জেলার বড় আড়তে পাঠান। বর্ষার তিন থেকে চার মাস এ বেচাকেনা চলে। চলনবিলে প্রতিবছর প্রায় কোটি টাকার শামুক বেচাকেনা হয় বলে তাঁদের ধারণা।

তবে প্রতিদিন কী পরিমাণ শামুক আহরণ করা হচ্ছে, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। একই সঙ্গে বিলের বিভিন্ন প্রজাতির শামুকের মজুত, বংশবিস্তার ও পুনরুৎপাদনের অবস্থা সম্পর্কেও পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায় না। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এ বাণিজ্যের পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

শামুক ও ঝিনুক জলজ বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রজাতিভেদে এসব প্রাণী পানির ক্ষুদ্র জীব ও জৈব পদার্থ খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর খাদ্য হিসেবেও শামুক গুরুত্বপূর্ণ। কিছু প্রজাতি পানির কণাবস্তু ছেঁকে খাওয়ার মাধ্যমে পানির স্বচ্ছতা ও পুষ্টিচক্রেও ভূমিকা রাখে।

তাড়াশ ডিগ্রি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বিদ্যুৎ কুমার বলেন, উন্মুক্ত জলাশয়, বিশেষ করে খাল-বিল ও হাওর-বাঁওড়ে শামুক-ঝিনুক বংশবিস্তার করে। জলাশয়ে থাকা বিভিন্ন ক্ষুদ্র জীব ও জৈব পদার্থ খাওয়ার মাধ্যমে এগুলো পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। পাশাপাশি স্থানীয় মিঠাপানির মাছের খাদ্যের চাহিদা পূরণেও শামুক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত হারে শামুক নিধন চলতে থাকলে জলজ পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র‍্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই শামুক আহরণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বিচারে সংগ্রহ বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শামুকের সংখ্যা কমে গেলে জলজ খাদ্যশৃঙ্খল, পুষ্টিচক্র ও সংশ্লিষ্ট প্রাণীর ওপর প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে চলনবিলে শামুকের প্রকৃত মজুত, প্রজাতিভিত্তিক সংখ্যা ও আহরণের প্রভাব নির্ধারণে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক জরিপ জরুরি। শামুক সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও মাঠপর্যায়ে আহরণ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বিদ্যুৎ কুমার জানান, সরকারিভাবে শামুক-ঝিনুক সংরক্ষণে উদ্যোগ বা প্রকল্প থাকলেও এ অঞ্চলে সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। শামুক জলাশয়ের প্রাকৃতিক পরিশোধন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। তাই এ প্রাণী সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনের আওতায় শামুক সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। তবে প্রজাতি, আইনের প্রযোজ্য বিধান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার যাচাই করে আইন প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ