১৭ অক্টোবর ২০২৬ , ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

অলস ক্ষমতার ফাঁদ পেরিয়ে বিদ্যুৎ খাতে স্থায়ী সমাধান কোন পথে

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ১৭-১০-২০২৬
অলস ক্ষমতার ফাঁদ পেরিয়ে বিদ্যুৎ খাতে স্থায়ী সমাধান কোন পথে সংগৃহীত

নিজের বাড়ি না থাকলে প্রয়োজনে বাসা ভাড়া নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে। কিন্তু একটি পরিবারের জন্য একসঙ্গে পাঁচটি বাড়ি ভাড়া নেওয়ার অর্থ হলো নিশ্চিত আর্থিক বিপর্যয়। গত এক দশক ধরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ঠিক এই কাজটিই করে আসছে। দেশের অনেক বিদ্যুৎ চুক্তিতে এমন শর্ত রয়েছে যে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বা সরবরাহ না পেলেও কেবল ক্ষমতার জন্য নিয়মিত অর্থ পরিশোধ করতে হয়, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের সঙ্গে সম্পৃক্ত চড়া ব্যয়। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত আমদানি সহ দেশের গ্রিড-সংযুক্ত মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ২৮,৯১৯ মেগাওয়াট। অথচ বিদ্যুৎ বিভাগের সেপ্টেম্বর মাসের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ মে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১৭,২০১ মেগাওয়াট—আর সেটিও কিন্তু চূড়ান্ত বা পিক ডিমান্ড নয়। এদিকে পাওয়ার গ্রিডের প্রতি ঘণ্টার রেকর্ড বলছে, গত ১০ সেপ্টেম্বর দুপুর ৩টাতেই ৩,৫৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। কাগজে-কলমে বিশাল সক্ষমতা থাকা মানেই যে সকেটে বা গ্রাহকের ঘরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ মিলবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বিদ্যুৎ খাতের সমস্যা মূলত দুটি, যার একটি হলো অতিরিক্ত ও অলস ইনস্টলড ক্যাপাসিটি এবং অন্যটি আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা। বিদ্যুৎ বিভাগ ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ৩২,৬৮৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার কথা জানালেও, এর মধ্যে ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা গ্রিড সক্ষমতার সঙ্গে মেলানো ঠিক হবে না। আইইইএফএ-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রিজার্ভ মার্জিন ছিল ৬১.৩ শতাংশ, তবে এগুলো বর্তমান জ্বালানি-সমর্থিত প্রকৃত রিজার্ভের সঠিক চিত্র তুলে ধরে না। অন্যদিকে, প্রাথমিক জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা ২০২০-২১ অর্থবছরের ৪৭.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৬২.৫ শতাংশে, যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচ বেড়েছে ৮৩ শতাংশ। জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারের দাম বছরের গড় পর্যায়ে স্থিতিশীল থাকলে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির বিল ২.৮ বিলিয়ন ডলার বা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় আর্থিক বোঝা হলো এই ক্যাপাসিটি পেমেন্ট। বিইআরসি-র মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সার্বিক ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও রেন্টাল চার্জ ৫২৬.০৮ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়াতে পারে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪৮২.৬০ বিলিয়ন টাকা। এর পাশাপাশি রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি বিল বকেয়া ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের চাপ। চলতি বছরের এপ্রিলে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী পেমেন্ট বা অর্থ পরিশোধে প্রায় ৩০০ দিনের বিলম্ব ঘটছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২৩.০২ টাকা। একটি আদর্শ বা অতীতের ৮০ টাকা বেসলাইনের সঙ্গে তুলনা করলে, একই ডলারের দেনা মেটাতে এখন প্রায় ৫৩.৮ শতাংশ বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। বিদেশি মুদ্রায় দেনা এবং চড়া ঋণের ওপর ভিত্তি করে দেশের জাতীয় বেজ-লোড বা স্থায়ী বিদ্যুৎ নিরাপত্তার ভিত্তি গড়া সম্ভব নয়।
বিপিডিবির অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, ফার্নেস অয়েল ভিত্তিক কিছু স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীর সঙ্গে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ বা সাসপেনশন ক্লজ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় এসব চুক্তি পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে বাতিল করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি পেমেন্ট কমানোর একটি কার্যকর উপায় হতে পারে জরুরি ও অপরিহার্য আইপিপি প্ল্যান্টগুলোকে সচল রাখা এবং চাহিদা ও জ্বালানি সরবরাহ সাপেক্ষে সেগুলোর শতভাগ সক্ষমতা ব্যবহার করা। এর পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় চুক্তিগুলো পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে বাতিল করতে হবে, যাতে সিস্টেমের প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী প্ল্যান্টগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়।
দ্বিতীয় বড় দুর্বলতা হলো জ্বালানি সংকট। আইইইএফএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি ফার্নেস অয়েল প্ল্যান্টগুলোতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় খরচ পড়েছে প্রায় ২৭.৫০ টাকা, যার মধ্যে ক্যাপাসিটি পেমেন্টই একটি বড় অংশ। গ্যাসের ঘাটতির কারণেও অনেক প্ল্যান্ট বসিয়ে রাখতে হয়। এপ্রিলের এক সামার-প্ল্যানিং রিপোর্ট অনুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক ১২,২০৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্ল্যান্টগুলো সচল রাখতে দৈনিক প্রায় ২,৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছিল মাত্র ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেও বড় অংকের ব্যয়ঝুঁকি রয়েছে। বার্ষিক ৭৩০ বিলিয়ন ঘনফুট আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি এমএমবিটিইউ ১২ ডলার ধরলে বিল আসবে প্রায় ৮.৫ বিলিয়ন ডলার, আর দাম ২০ ডলারে পৌঁছালে তা ১৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। কাতারএনার্জির সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেও বিকল্প উৎস বা কার্গো অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে, তবে কেবল কাগজে-কলমে চুক্তি দিয়ে জ্বালানি বা বৈদেশিক মুদ্রার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় না।
ভারতের সঙ্গে আন্তঃসংযোগ গ্রিডের মাধ্যমে আদানি পাওয়ারের গোড্ডা প্ল্যান্ট থেকে ১,৪৯৬ মেগাওয়াট, ভেড়ামারা ও ত্রিপুরা হয়ে ১,১৬০ মেগাওয়াট এবং নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াটসহ মোট ২,৬৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ রয়েছে। ভারতের এই সক্ষমতা মে মাসের মোট গ্রিড ক্ষমতার প্রায় ৯ শতাংশ। জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে বিপিডিবির চেয়ারম্যানের বরাত দিয়ে জানানো হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আদানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের খরচ প্রতি ইউনিট ১৩.৮৩ টাকা হতে পারে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৫৫.৮৭ বিলিয়ন টাকা ভর্তুকির আবেদন করা হয়েছে, যদিও এই আবেদন মানেই চূড়ান্ত অনুমোদিত অর্থ পরিশোধ নয়। এর আগে বকেয়া পরিশোধ নিয়ে জটিলতার কারণে সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটেছিল। ভারত আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলেও, কেবল একটি একক সরবরাহকারী বা চুক্তির ওপর দেশের হাসপাতালের মতো জরুরি খাতগুলো নির্ভরশীল রাখা ঝুঁকিপূর্ণ।
দেশের জ্বালানি খাতের সংস্কারে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৫,৫০০ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার, ৪,৫০০ মেগাওয়াট গ্রাউন্ড-মাউন্টেড সোলার এবং অন্যান্য উৎস থেকে আরও প্রায় ১,০০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। সেপ্টেম্বর মাসের ঘোষণা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু সোলার উপকরণের ওপর আমদানি শুল্ক কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ১,২০০ মেগাওয়াটের চুল্লি থেকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। সম্প্রতি এই প্রকল্পের ফুয়েল লোডিং, সেফটি-ভালভ প্রেশার টেস্ট এবং পারমাণবিক জ্বালানি সাইটে পৌঁছানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকগুলো সম্পন্ন হয়েছে, যদিও এগুলো বাণিজ্যিক গ্রিড অপারেশনের চূড়ান্ত ছাড়পত্র নয়। এর বাইরে ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের নির্মাণ চুক্তির সঙ্গে ২০১৬ সালে স্বাক্ষরিত ১১.৩৮ বিলিয়ন ডলারের রুশ ঋণচুক্তি আলাদা করে দেখতে হবে।
গ্রীষ্মের রাতে কিংবা লোড ব্যবস্থাপনার সময় প্রকৃত জবাবদিহিতা কার হাতে থাকবে? পারমাণবিক ও বড় কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে, তবে কেবল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হওয়াটাই সব ঝুঁকি দূর করে না। বিপিডিবির ওপর নির্ভরযোগ্য বেজ-লোড সরবরাহের একটি আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত। এক্ষেত্রে ১৩ হাজার মেগাওয়াটকে একটি পরিকল্পিত বেঞ্চমার্ক হিসেবে ধরে প্রতি ঘণ্টার চাহিদা এবং রিজার্ভের প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন করা যেতে পারে। পারমাণবিক, কয়লা এবং দেশীয় গ্যাসের সমন্বয়ে দেশের শক্তির মূল কাঠামো গড়ে ওঠা উচিত। কোর ফ্লিট বা মূল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পরিচালনার দায়িত্ব বিপিডিবির হাতে রাখা হলেও, রূপপুরের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অপারেটর এবং পাওয়ার গ্রিডের স্বাধীন ভূমিকা বজায় রাখতে হবে। অলস ক্ষমতার পেছনে অর্থ ঢালার আগে জ্বালানি নিশ্চিত করা এবং নতুন বেসরকারি চুক্তিগুলোকে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট মুক্ত ও টাকার অঙ্কে সীমিত রাখা প্রয়োজন। পাকিস্তান যদি তাদের ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ৬০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১.৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারবে না?
অনেকেই হয়তো বলবেন বিপিডিবির নিজেরই আর্থিক সংকট রয়েছে। কিন্তু এটি দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার যুক্তি নয়, বরং কাঠামোগত সংস্কার ও সঠিক তহবিল বরাদ্দের জোরালো দাবি। সঠিক বাজেট বরাদ্দ, প্রকৃত খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ট্যারিফ, স্বচ্ছ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ গ্রহণের উপযোগী গ্রিড নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশও আর অযথা অতিরিক্ত ঘরভাড়া গুনবে না, বরং নিজের স্থায়ী শক্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।
 


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ