ছবিঃ সংগৃহীত
ব্যাংকিং খাতের নানা অনিয়ম, চলমান আর্থিক অস্থিতিশীলতা এবং সুদের আকর্ষক হারের কারণে দেশের সাধারণ মানুষ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা আবারও ঝুঁকছেন সরকারি সঞ্চয়পত্রের দিকে। দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতিবিদরা এটিকে ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থার ঘাটতির বড় লক্ষণ হিসেবে দেখলেও, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি ভিন্ন। ফলে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সঞ্চয়পত্র খাত নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।
চলতি অর্থবছরের সূচনালগ্নেই সঞ্চয়পত্র বিক্রির চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৪৬৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৭১ কোটি টাকার কাছাকাছি।
হিসাব অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে এই খাতে নিট বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ। এর মধ্যে কেবল আগস্ট মাসেই নিট বিক্রি হয়েছে ৪০৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকার বেশি। বিগত টানা দুই অর্থবছর সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি নেতিবাচক ধারায় থাকলেও নতুন অর্থবছরের শুরুতেই এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের পরিবর্তিত মানসিকতার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ার মূল কারণ মানুষের হাতে অতিরিক্ত সঞ্চয় জমা হওয়া নয়; বরং ব্যাংক খাতের ওপর আস্থার সংকট। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতে ঋণ জালিয়াতি, তারল্য সংকট এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় সাধারণ আমানতকারীরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
বিশেষ করে ছোট ও মধ্যম সারির বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনার এই খাতটিকে অনেক বেশি নিরাপদ মনে করছেন। দেশের অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন দ্রুত ফিরিয়ে না আনলে এবং সুদের হারে স্বচ্ছতা না থাকলে এই প্রবণতা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
বিনিয়োগকারীরা সঞ্চয়পত্রে আকৃষ্ট হওয়ার পেছনে মুনাফার হার অপরিবর্তিত থাকাও একটি বড় নিয়ামক। বর্তমান অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য সরকার সঞ্চয়পত্রের পূর্বনির্ধারিত মুনাফার হার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে সর্বোচ্চ মুনাফার হার প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি থাকছে, যা উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে বিনিয়োগকারীদের কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে।
এছাড়াও, সরকারি গ্যারান্টি থাকায় এতে ঝুঁকির পরিমাণ নেই বললেই চলে। নিয়মিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা তাই অন্যান্য বাণিজ্যিক মাধ্যমের চেয়ে সঞ্চয়পত্রকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।
সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ইতিবাচক হওয়ার ফলে সরকারের ঋণ স্থিতির পরিমাণও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগস্ট মাস শেষে সঞ্চয়পত্র বাবদ সরকারের মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকার বেশি। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার সাধারণত ব্যাংক ঋণ ও সঞ্চয়পত্রের ওপর ভরসা করে থাকে।
তবে চলতি অর্থবছরে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নামিয়ে এনেছে। অতীতে মেয়াদপূর্তিতে বিপুল পরিমাণ আসল ও মুনাফা পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারকে হিমশিম খেতে হলেও বর্তমান ইতিবাচক বিক্রি সেই চাপ সামলাতে কিছুটা সহায়তা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিনিয়োগ বৃদ্ধির পেছনের কারণ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কার বিপরীতে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়ার অর্থ এই নয় যে ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা সম্পূর্ণ উঠে গেছে।
তাদের মতে, ব্যাংকগুলোতেও নিয়মিতভাবে আমানত জমা হওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। নাগরিকরা তাদের আর্থিক পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যময় করতে বিভিন্ন খাতে অর্থ বণ্টন করে থাকেন। তাই সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বাড়ার বিষয়টিকে ব্যাংকিং খাতের আস্থার সংকটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার সুযোগ নেই। সার্বিক বিবেচনায়, অর্থনীতির এই গতিপ্রকৃতি আগামী মাসগুলোতে দেশের আর্থিক খাতের সামগ্রিক স্থায়িত্ব নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।