ছবিঃ সংগৃহীত
ভোর হলেই খোকসার ওসমানপুর খেয়া ঘাটের পাশের এক ঝুপড়ি দোকান ঘর থেকে ভেসে আসে শানের চাকার ঘুরঘুর শব্দ। সেই শব্দেই শুরু হয় তরুণ কর্মকারের দিন। ৪৫ বছর বয়সী তরুণের পুরো জীবনটাই যেন বাঁধা পড়েছে এই শানের চাকায়। শৈশবে বাবার হাত ধরে যে কাজের হাতেখড়ি হয়েছিল, আজ মধ্যবয়সে এসেও সেই ঐতিহ্য ধরে রেখে চলছে তাঁর সংসারের চাকা। কাঁচি কিংবা ছুরি শান দেওয়া কেবল তাঁর পেশা নয়, বরং পরিবার-পরিজন নিয়ে টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন। ওসমানপুর খেয়া ঘাট সংলগ্ন ছোট দোকানটিতে গিয়ে দেখা যায়, শান দেওয়ার বড় চাকার সামনে একাগ্র চিত্তে বসে কাজ করছেন তরুণ কর্মকার। চারপাশে ছড়ানো হাতুড়ি, প্লাস ও হরেক রকমের সরঞ্জাম। তার মাঝেই অতি মনোযোগে ধার দিচ্ছেন কাঁচিতে। শানের ঘর্ষণে তৈরি হওয়া আগুনের স্ফুলিঙ্গ আর ধারালো কাঁচির মতোই কঠিন ও তীক্ষ্ণ তাঁর জীবনসংগ্রাম। তিন পুরুষ ধরে চলা এই শান ব্যবসাকে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকিয়ে রেখেছেন তিনি। আধুনিক যুগের পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে সব খাতেই। প্রযুক্তি আর আধুনিক সামগ্রীর ব্যবহারে ঐতিহ্যবাহী এই পেশায় এসেছে চরম ভাটা। তরুণ কর্মকার জানান, আগের মতো সাধারণ মানুষ এখন আর নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালি কাজের কাঁচি, ছুরি বা খুর শান দিতে আসে না। বর্তমানে মূলত পেশাদারি তাগিদেই দর্জি বা টেইলার্সের মালিক এবং পরামানিক (নরসুন্দর) সম্প্রদায়ের লোকেরাই কাঁচি করাতে তাঁর কাছে আসেন। ফলে দিন দিন কমে আসছে কাজের সুযোগ ও আয়। প্রতিদিনের আয়-ব্যয়ের হিসাবটাও তাঁর জন্য বেশ নির্মম। তরুণ কর্মকার বলেন, “প্রতিদিন শান দিয়ে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় হয়। কিন্তু দোকান ভাড়া ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিটাতেই চলে যায় ২০০ টাকার মতো। দিনশেষে হাতে থাকে মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।” বর্তমান বাজারে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির দিনে এই সামান্য আয় দিয়ে পরিবার চালানো যেন এক নিরন্তর যুদ্ধ। কালের গহ্বরে বিলুপ্তপ্রায় এই ঐতিহ্যবাহী পেশাকে আজও যাঁরা আঁকড়ে ধরে রেখেছেন, তরুণ কর্মকার তাঁদেরই একজন।