ছবিঃ সংগৃহীত
দুর্গাপূজা উপলক্ষে টানা ছুটিতে বদলে গেছে রাজধানী ঢাকার চিরচেনা চিত্র। প্রতিদিনের যানজট, গাড়ির হর্ন আর মানুষের ভিড়ে ব্যস্ত থাকা সড়কগুলো এখন অনেকটাই ফাঁকা। কমেছে গণপরিবহনের চাপ, সড়কে নেই কর্মব্যস্ত মানুষের সেই পরিচিত ছুটে চলা। ফলে যানজটের ভোগান্তি ছাড়াই তুলনামূলক কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন নগরবাসী।
বুধবার (২১ অক্টোবর) রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায়, কর্মদিবসের তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা অনেক কম। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতেও যানজটের চিরচেনা দৃশ্য তেমন চোখে পড়েনি। বাসের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা, সড়ক পারাপারে ভোগান্তি কিংবা অল্প দূরত্ব পাড়ি দিতে দীর্ঘ সময় আটকে থাকার মতো পরিস্থিতিও তুলনামূলক কম। কোথাও কোথাও যানবাহন চলেছে স্বাভাবিক গতিতে। যদিও কিছু এলাকায় ব্যস্ততা ছিল, সামগ্রিকভাবে রাজধানীর সড়কে চাপ ছিল কম।
সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ছুটি থাকায় কর্মজীবী মানুষের নিয়মিত যাতায়াত কমেছে। অনেকে পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ি কিংবা দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে গেছেন। এতে আবাসিক এলাকা, অফিসপাড়া ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে মানুষের উপস্থিতি কমেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সড়ক ও গণপরিবহনে।
রাজধানীর মালিবাগ এলাকায় কথা হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, সাধারণ সময়ে মালিবাগ থেকে মতিঝিল যেতে যানজটে অনেক সময় নষ্ট হয়। গাড়ির চাপ বেশি থাকলে অল্প দূরত্ব পাড়ি দিতেও বিরক্ত লাগে। ছুটিতে গাড়ি কম থাকায় চলাচল অনেক সহজ হয়েছে। প্রতিদিন এমন পরিবেশে অফিসে যেতে পারলে সময় ও মানসিক চাপ দুটোই কমত।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান গৃহিণী নাসরিন আক্তার। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কেনাকাটা করতে বের হয়ে তিনি বলেন, সাধারণত রাস্তায় বের হলে যানজট ও মানুষের ভিড় নিয়ে চিন্তা করতে হয়। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে চলাচল করা বেশ কষ্টকর। এখন ভিড় কম থাকায় স্বস্তিতে চলাফেরা করা যাচ্ছে। যানজট কম থাকলে কেনাকাটা বা প্রয়োজনীয় কাজ শেষে দ্রুত বাসায় ফেরা যায়।
বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ বলেন, ক্লাস কিংবা অন্য কাজে বের হলে যানজটের কারণে প্রায়ই দেরি হয়। কখন গন্তব্যে পৌঁছাব, তা নিয়েও দুশ্চিন্তা থাকে। ছুটির সময় গাড়ি কম থাকায় যাতায়াত সহজ হয়েছে। বিশেষ করে রিকশা ও মোটরসাইকেলে চলাচলের সময় আগের মতো দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকতে হচ্ছে না।
রামপুরা এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবদুল কাদেরও যানজট কমায় স্বস্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ঢাকায় কোথাও যেতে হলে যানজটের কথা মাথায় রেখে বাড়তি সময় হাতে নিয়ে বের হতে হয়। এখন সড়কে চাপ কম থাকায় প্রয়োজনীয় কাজ দ্রুত শেষ করে ফিরতে পারছেন। শহরে এমন পরিবেশ থাকলে মানুষের অনেক ভোগান্তি কমে যেত।
তবে সড়কে যানবাহনের চাপ কমলেও এর প্রভাব পড়েছে গণপরিবহন খাতে। কর্মদিবসে যেসব বাসে যাত্রী ওঠার জন্য প্রতিযোগিতা থাকে, ছুটির সময়ে সেগুলোতে যাত্রী তুলনামূলক কম। কোনো কোনো রুটে যাত্রী পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে পরিবহনকর্মীদের। ফলে যানজট কমায় চলাচল সহজ হলেও আয় কমেছে তাঁদের।
ভিক্টর পরিবহনের চালক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, সাধারণ দিনে সড়কে গাড়ির চাপ বেশি থাকায় যাত্রী ওঠানো-নামানোর পাশাপাশি দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হয়। ছুটিতে গাড়ি কম থাকায় বাস চালাতে সুবিধা হচ্ছে এবং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে সময়ও কম লাগছে। তবে যাত্রী কম থাকায় আয় কমে গেছে।
তুরাগ পরিবহনের চালকের সহকারী মো. সোহেল মিয়া বলেন, অন্য সময়ে বাসে যাত্রী বেশি থাকে। অনেক সময় বাসে ওঠার জন্য যাত্রীদের ভিড় দেখা যায়। এখন যাত্রী কম থাকায় বিভিন্ন স্টপেজে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। যানজট ছাড়া চলাচল করতে পারলেও যাত্রী কমে যাওয়ায় আয় কমেছে। নগরবাসীর মতে, সড়কে যানজট কম থাকলে সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি জ্বালানির অপচয় ও যাতায়াতের মানসিক চাপও কমানো সম্ভব। কিন্তু ছুটির সময়ের এই স্বস্তি সাময়িক। ছুটি শেষে অফিস-আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হলে সড়কে যানবাহন ও মানুষের চাপ আবার বাড়তে পারে।
সেগুনবাগিচার বাসিন্দা কাওসার আলম বলেন, টানা ছুটিতে অনেকেই পরিবার নিয়ে ঢাকার বাইরে গেছেন। তাই রাজধানী এখন অনেকটাই ফাঁকা। এতে যাঁরা ঢাকায় আছেন, তাঁরা স্বস্তিতে চলাচল করতে পারছেন। তবে ছুটি শেষে সেই স্বস্তি থাকবে না, ফিরে আসবে চিরচেনা যানজট। তারপরও সাময়িক সময়ের জন্য কিছুটা স্বস্তি পাওয়া কম কথা নয়।