২৪ অক্টোবর ২০২৬ , ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

​পুজার পর নীলফামারীর দর্শনীয় স্থানে উপচেপড়া ভীর

আপলোড সময় : ২৪-১০-২০২৬
​পুজার পর নীলফামারীর দর্শনীয় স্থানে উপচেপড়া ভীর সংগৃহীত ছবি

তৈয়ব আলী সরকার, নীলফামারী : নীলফামারীতে বিনোদন কেন্দ্রের আনন্দ খানিকটা ভিন্ন সাধের। তাই পুজার আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে প্রকৃতির আলো বাতাস আর সৌন্দর্য উপভোগ করতে নীলসাগর, তিস্তা ব্যারাজ, চিনি মসজিদ, কুন্দু রাজার মাজার, হরিশ্চন্দ্র রাজার বাড়ী, দিনাজপুর ক্যানেল, পাল রাজার বাড়ী, ধর্মপালের গড়, শত বছরের হাতির কড়াই, খৃীচিয়ান গীর্জা ও নীল কুঠিরের টর্চাসেল দেখতে দর্শনার্থীর উপচেপড়া ভীড়।

মহাষষ্ঠী থেকে সনাতন ধর্মের মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রের দিকে ছুঁটছেন। এসময় বিনোদন কেন্দ্র গুলো যেন মিলন মেলায় পরিনত হয়েছে। বিশেষ করে শিশু, কিশোর, কিশোরীসহ সকল বয়সের মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। জেলা শহর থেকে যাতায়তের জন্য রয়েছে বাস, মাইক্রোবাস, জিপ, পিকআপ, ইজিবাইক, প্রাইভেটকার, আর পাঁয়ে হেটে আসা মানুষ গুলো সরগম করছে এসব এলাকা।

নীলকুঠিঃ-১৮০০ খিষ্ট্রাব্দে নীলফামারী জেলা সদরের মৌজা নটখানায় নীলচাষের একটি বৃহৎ খামার ছিল। ১৮৪৭-৪৮ খিষ্ট্রাব্দে নীলচাষে লোকসান হওয়ায় আন্দোলনের মুখে কৃষকরা নীলচাষ বন্ধ করে দেয়। আর এতে নেমে আসে নিরহ কৃষকদের ওপর বিট্রিশদের নিপীড়ন নির্যাতন, অত্যাচার। সেখানে নীল চাষে অবাদ্ধ কৃষকদের টর্চাসেলে নির্যাতন করা হতো। কৃষক বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, তেঁভাগা আন্দোলন, ৫২‘ ভাষা আন্দোলন ও ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ নীলফামারীর ইতিহাসে এক অন্যতম অধ্যায়।

১৮৫৯-৬০ সালে কৃষকদের আন্দোলনের মুখে এলাকা ছেড়ে নীলকরেরা পালিয়ে যেতে বাদ্য হয়। সেই নীলখামার থেকে নীলখামারী। তাই নীল বিদ্রোহে আর্জিত নাম নীলফামারী। নীল কুঠিটি আজো কালের সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জেলা শহরের নটখানা গ্রামে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেলফিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের কর্মীরা আসে ছবি তুলতে।

খৃীচিয়ান গির্জাঃÑ ১৮৮৬ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে সম্প্রসারণের সময় সৈয়দপুরে ব্রিটিশ ও ইন্ডিয়ান শ্রকিদের বসতি গড়ে উঠে। তাদের ধর্মীয় উপসনা করার জন্য ব্রিটিশ সরকার সে সময় ক্যাথলিক গির্জাটি নির্মাণ করেন। শহরের গোলারহাটে রয়েছে বিট্রিশদের হাতে তৈরী ১৪০ বছরের পুরাতন গির্জাটি। এটি দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রথম এবং প্রাচীনতম গির্জা। আজও কালের সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নয়নাভিরাম লাল ইটের এই গির্জাটি।

এ ছাড়াও বিনোদনের জন্য রয়েছে, ভিমের মায়ের চুলা, দেশের সর্ববৃহৎ রেলওয়ে কারখানা। ঈদ বা পুজার আনন্দ ভাগাভাগি করতে ছুটে আসে রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহী, পঞ্চগড়, গাইবান্দা, লালমনিরহাট, জয়পুরহাট থেকেও মানুষজন এসব প্রকৃতির বিনোদন কেন্দ্রে।
দর্শনীয় স্থান নীলসাগরঃÑজানা যায়, বিরাট রাজার একমাত্র মেয়ে বিন্নাবতীর গোসলের জন্য ওই পুকুর খনন করা হয়। আবার অনেকেই বলে হাজার বছর আগে রাজার গরুর পানী খাওয়ানোর জন্য ওই পুকুর খনন করেন। এর আয়তন ৫৩ দশমিক ৯০ একর। পানির গভীরতা সারা বছর ৪৫-৫০ ফিট। হিন্দুদের মহাভারতে বর্ণিত বিরাট রাজা কুরক্ষেত্রের যুদ্ধে নিহত হলে এই দিঘির পাড়ে তাকে সমাহিত করা হয়। প্রতœতাত্বিকের মতে ১০০০ থেকে ১২০০ অব্দের মধ্যে বিন্নাদিঘি খনন করা হয়। দিঘিটি নীলফামারী সদরের গোড়গ্রাম ইউনিয়নের হাজিগঞ্জে অবস্থিত।

বিন্নাবতীর নাম অনুশারে পুকুরের নামকরন করা হয় বিন্নাদিঘি। বর্তমানে এখানে অতিথি পাখির অভয়ারণ্য ও মাছ শিকারের জন্য রয়েছে টিকিটের ব্যবস্থা। শিশুদের জন্য রয়েছে নৌকা, স্পিটবোড, চড়কি, ঘোড়ার গাড়ী, পানশি নৌকা আর রাশি রাশি গুল্মলতা, বেতবন, দিঘীর চারিদিকে রয়েছে সুউচ্চ পাড়বেষ্টিত বিভিন্ন প্রজাতির সুন্দর সুন্দর গাছপালা। এখানকার প্রবেশ মুল্য জনপ্রতি ২০ টাকা, মোটরসাইকেল ৫০, বাস ৩০০, মাইক্রো ১০০, মাছ ধরা দুই হাজার টাকা। রাতে থাকার জন্য রয়েছে স্বল্প মূল্যে শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত আবাসিক হোটেল। আবার অনেকেই আসেন গাভীর প্রথম দুধ পুকুরে ঢেলে দিতে। প্রবাদ আছে ওই পুকুরে দুধ দিলে গাভীর দুধের পরিমান বেশী হয়। এছাড়াও হিন্দুরা মানত করে দূর দূরন্ত থেকে প্রসাদ নিয়ে আসে বিতরনের জন্য।

তিস্তা ব্যারাজঃ-১৯৭৯ সালে তিস্তা ব্যারাজ লালমনির হাট জেলার হাতিবান্দা ও নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার সিমান্ত এলাকায় স্থাপন করা হয়। এর দৈর্ঘ প্রায় ৬১৫ মিটার। প্রত্যেক বছরে দূর্গা পুজা ও দুই ঈদে বিনোদন প্রেমি মানুষ সেখানে ঘুরতে যায়। তিস্তা অববাহিকার স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্ষুত্র ব্যবসায়িরা হরেক রকম খাবারের দোকানসহ বাড়তি বিনোদনের জন্য বসিয়েছেন চর্কিখেলা, মিনি লটারী, বেলুন (টার্গেট) সুটসহ বিভিন্ন সামাজিক খেলা। ব্যারাজের ভ্রাম্যমান চায়ের দোকানদার আবুল হোসেন জানান, পুজা ও দুই ঈদে বাড়তি বেচাকেনা ভালই হয়। এখানে স্থায়ীভাবে পিকনিক স্পট বা পার্কের ব্যবস্থা করা হলে আমাদের মত গরীবের জন্য ভাল হতো।

এছাড়াও বিনোদনের জন্য প্রস্তত রয়েছে, নৌকা বাইচ, স্পিটবোড ও পানসি নৌকা। জনপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকার বিনিময়ে দর্শনার্থীদের নিয়ে তিস্তার অপরুপ দৃশ্য দেখতে অথৈই পানিতে স্পিট বোডে ঘুরছেন। এদিকে, হাজারো দর্শনার্থী তিস্তা নদীর অপরুপ দৃশ্য ও সেলফি তোলার হিড়িক পড়ে। এর সাথে নিজেদের রান্না করা খাবার গাছ তলায় বসে খাওয়ার মজাই আলাদা। মুক্ত হাওয়ায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা আনন্দের মাত্রাকে বাড়িয়ে দেয় তিস্তা ব্যারাজ।

ধর্মপালের গড়ঃÑবাংলার ইতিহাসে পাল বংশ ৭৫০ থেকে ১১২১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪০০ বছর ধরে বাংলা ও বিহারে রাজত্ব করেন। জেলার জলঢাকার উপজেলার খেরকাটি ইউনিয়নের ধর্মপাল গ্রামে রয়েছে পালবংশের বিভিন্ন নিদর্শন। পুরাতন মন্দির, রাজপ্রসাদ, রান্নাঘর ও অতিথিশালা। দেশের বিভিন্ন এলাকার ভ্রমনপিপাসু মানুষ দেখতে আসে। সেই সময় গড়টি পালরাজার বাড়ীর প্রাচীর হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

ধর্মপাল গড় এলাকার বাসিন্দা বিনোদ রায় (৬০) বলেন, দুই ঈদ ছাড়াও পুজাপর্বনে এখন হাজারো মানুষজন ছুটে আসে পাল রাজার বাড়ী দেখতে। মাটির নিচে তলিয়ে থাকা ধর্মরাজার মন্দির ও রাজ প্রসাদ বেড়িয়ে আসায় বিনোদন প্রেমী মানুষ এসব দেখতে আসছে। বিনা টিকেটে প্রকৃতির আলো বাতাসে এসব ঘুরে দেখছেন মানুষ।

কুন্দুপুকুর মাজারঃ- এটি শাহ্ সুফি হযরত মীর মহিউদ্দিন চিশতি (রঃ) এর মাজার। ১২০০ হিজরীতে ৩০ একর জায়গা জুড়ে রয়েছে মাজার ও মাজার সংলগ্ন বিশাল আয়তনের একটি পুকুর। প্রতিবছর মাঘ মাসের ৫ তারিখ থেকে ৮ তারিখ পর্যন্ত তিনদিন ব্যপি ওরস শরিফ অনুষ্ঠিত হয়। জনশ্রæতি আছে ওই পুকুরের পানি পান করলে মানুষের রোগ মুক্তি পায়। এজন্য বছরের সব সময় বিভিন্ন এলাকার মানুষ সিন্নি নিয়ে আসে এবং তোবারক বিলি করেন ও নিয়ত করে পুকুরের পানি নিয়ে যায়। এই মাজারে প্রতিদিন ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ দোয়া, মান্নত ও সিন্নি নিয়ে আসেন পীরের মাজারে। জেলা শহর থেকে চার কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে কুন্দুপকুর ইউনিয়নে অবস্থিত কুন্দুপকুর মাজার। জেলা শহর থেকে সেখানে বাস, মাইক্রো, ইজিবাইক ও রিকশায় যাওয়া যায়।

জেলা প্রশাসক হুমায়ুন কবির জানান, বিনাœদিঘী এলাকাটি ১৯৮২ সালে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আধুনিকতার ছোঁয়ায় জেলার নাম অনুশারে নামকরন করা হয় নীলসাগর। এখানে জেলা প্রশাসনের তত্বাবধয়নে সকল সুবিধা দর্শনার্থীদের দেওয়া হয়। নীলসাগরে রাত্রী যাপনের জন্য রয়েছে শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত আবাসিক হোটেল। মাছ শিকারের জন্য রয়েছে সুব্যবস্থা। তিনি তিস্তা ব্যারাজ, নীলসাগর, চিনি মসজিদ, চারশ বছরের খৃীচিয়ান র্গীজা, পাল রাজার বাড়ীসহ নীলফামারীর প্রকৃতির বিনোদন কেন্দ্র গুলো ঘুরে যাওয়ার আমন্ত্রন জানিয়েছেন।


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ