২৭ অক্টোবর ২০২৬ , ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

মা-বাবার অতিরিক্ত শাসন বনাম বিষাক্ত প্যারেন্টিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ২৫-১০-২০২৬
মা-বাবার অতিরিক্ত শাসন বনাম বিষাক্ত প্যারেন্টিং ছবিঃ সংগৃহীত

“মা ইচ্ছে করে সন্তানের ক্ষতি করবেন—এটা হতে পারে না। মায়ের মতো আপন আসলে পৃথিবীতে কেউ নেই।” এই চিরন্তন সত্যবাক্য দিয়ে ভালোবাসার পরিধি মাপা যায় বটে, কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো—মাঝেমধ্যে এই মায়াবী সম্পর্কের ছায়াতলেই সন্তান সবচেয়ে বেশি ক্ষতবিক্ষত হয়। কথাটি শুনতে অবাক লাগলেও বহুলাংশে সত্য।

কিছুদিন আগে একজন নামকরা চিকিৎসকের সঙ্গে আমার দীর্ঘ দুই ঘণ্টার একটি ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে পরামর্শ সেশন ছিল। তিন, পাঁচ ও দশ বছরের আর্থিক লক্ষ্য নির্ধারণের কথা বলতে বলতে আলোচনা একসময় জীবনের গভীরে চলে যায়। আর্থিক পরিকল্পনার সঙ্গে মানুষের মানসিক ও পারিবারিক জীবনের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। কথা বলতে বলতে চিকিৎসক একপর্যায়ে খুব ভারী কণ্ঠে বললেন, “আমি এখন আমার স্ত্রীর বাড়িতে বা আলাদা থাকি। আমার মা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন।”

শুনলে মনে হতে পারে, সন্তান হয়তো অবাধ্য বা সমাজের চোখে বড় কোনো অপরাধ করেছে। কিন্তু আলোচনার গভীরে উঠে এল এক ভিন্ন ও মর্মান্তিক চিত্র।

চিকিৎসক তাঁর বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। তাঁর একটি ছোট বোনও রয়েছে। বাবা সরকারি চাকরি করতেন এবং এখন প্রয়াত। পৈতৃক সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার সূত্রে মা, ছেলে ও বোনের অংশ থাকার কথা। কিন্তু চিকিৎসক সবাইকে লিখিত ও মৌখিকভাবে জানিয়ে দিয়েছেন—তিনি সেই সম্পত্তির এক কানাকড়িও নেবেন না। নিজের সম্মান ও মানসিক শান্তি বজায় রাখতে তিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে চিরতরে সেই ঘর ছেড়ে চলে এসেছেন।

কথা বলতে বলতে তাঁর চোখ-মুখ ছলছল করে উঠল। মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সম্মান আজও আছে, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আজীবন বয়ে বেড়ানো এক অদৃশ্য কষ্ট। তিনি ছোটবেলার স্মৃতিচারণা করে বললেন, “মায়ের আদর কেমন ছিল, তা আমার মনে পড়ে না। মনে আছে শুধু বকাবকি আর মারধর। স্কুলে ভালো ফল না করলে, ক্লাসে প্রথম বা দ্বিতীয় হতে না পারলে, খেলার মাঠ থেকে মা আমাকে সবার সামনে টেনেহিঁচড়ে এনে পেটাতে শুরু করতেন। গণপরিবহনের বাসের ভেতরেও মারধর করতেন। বাসায় এসে রান্নাঘরের খুন্তি দিয়ে এমনভাবে মেরেছেন যে খুন্তি পর্যন্ত বাঁকা হয়ে গেছে!”

আজ ষাটোর্ধ্ব বয়সেও মায়ের সেই আগ্রাসী মেজাজ বিন্দুমাত্র বদলায়নি। মা কেন এমন করেছিলেন? একটু গভীরে তাকালে বোঝা যায়, মা চেয়েছিলেন সন্তানকে এমন এক শিখরে পৌঁছে দিতে, যেখানে সবাই পৌঁছাতে পারে না। সন্তানের কোনো পরাজয় বা সামান্য ঘাটতিও তিনি মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু এই অন্ধ জেদ ও অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপে সন্তানটি তার স্বাভাবিক মানসিক বিকাশের সুযোগ হারিয়েছিল।

আজ তিনি নিজেই একজন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক ও বাবা। কিন্তু ছোটবেলার সেই মানসিক আঘাতজনিত হীনম্মন্যতা আজও তাঁর পিছু ছাড়েনি। আজও কোনো বড় সিদ্ধান্ত নিতে গেলে তিনি গভীর দোদুল্যমানতায় ভোগেন—“সিদ্ধান্তটা কি ঠিক হবে, নাকি মা বা অন্য কেউ এটাকে ভুল বলবেন?”

আধুনিক অভিভাবকত্বের দর্শন ও মনস্তাত্ত্বিক সত্য ফরাসি দার্শনিক জঁ-জাক রুশো তাঁর ‘এমিল’ গ্রন্থে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ও স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের পথে জোর করে কোনো রূপ চাপিয়ে দিলে তার ব্যক্তিত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

আজকের বিশ্ব একটি বৈশ্বিক গ্রাম। প্রযুক্তি ও তথ্যের অবাধ প্রসারের কারণে আমাদের সন্তানেরা অনেক বেশি সচেতন, সংবেদনশীল ও স্মার্ট। আপনি চাইলেই আর পাথরের মতো কঠোর বা একরোখা শাসন তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারবেন না।

প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী কার্ল রজার্স তাঁর তত্ত্বে মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে ‘শর্তহীন ইতিবাচক গ্রহণযোগ্যতা’র ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায় শর্তসাপেক্ষ ভালোবাসা—“তুমি ভালো ফল করলেই কেবল আমি তোমাকে ভালোবাসব বা তোমার প্রশংসা করব।” যখন ভালোবাসা শর্তের বেড়াজালে বন্দি হয়, তখন সন্তানের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সে নিজের খুশিতে বাঁচতে শেখে না; বরং অন্যদের প্রত্যাশা পূরণের এক জীবন্ত পুতুলে পরিণত হয়।

প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী জন গটম্যানের অভিভাবকত্ববিষয়ক গবেষণায়ও শিশুর আবেগকে স্বীকৃতি দেওয়া ও তার সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলার গুরুত্ব উঠে এসেছে। যেসব বাবা-মা সন্তানদের আবেগকে সম্মান না করে সব সময় তাদের ওপর কঠোর কর্তৃত্ব ফলান, সেই শিশুরা বড় হয়ে আত্মবিশ্বাসের অভাব ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারে।

বাবা-মা কি তবে কখনোই শাসন করবেন না?

এর অর্থ এই নয় যে সন্তানদের যা খুশি তা করার অবাধ স্বাধীনতা দিতে হবে। অতিরিক্ত প্রশ্রয়, প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ কিংবা সীমাহীন স্বাধীনতা যেমন একটি শিশুর বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তেমনি অতিরিক্ত কঠোরতা, নিপীড়ন ও মারধর তার ভেতরের সৃজনশীলতাকে চিরতরে গলা টিপে হত্যা করতে পারে।

কৃত্রিম সংকট বা প্রয়োজনীয় সংগ্রাম: সন্তানকে সবকিছু থালায় সাজিয়ে দেবেন না। জীবনের মূল্য বোঝানোর জন্য সামান্য সংগ্রাম ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তারা পরিশ্রমের গুরুত্ব বুঝতে পারে।

নিয়ন্ত্রণ বনাম সংযোগ: সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্কটি হতে হবে জলের মতো। জল যেমন চলার পথে কোনো পাথর দেখলে তার সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে পাথরকে পাশ কাটিয়ে নিজের পথ তৈরি করে নেয়, তেমনি সন্তানদের ভুলত্রুটিতে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে না জড়িয়ে বুদ্ধিমত্তা ও বন্ধুত্বের মাধ্যমে সঠিক পথ দেখাতে হবে।

আশার অপপ্রয়োগ করবেন না: নিজের অবাস্তব স্বপ্ন বা অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা পূরণের মাধ্যম হিসেবে সন্তানকে ব্যবহার করবেন না। আপনার সন্তান যদি চিত্রশিল্পী হতে চায়, তাকে জোর করে চিকিৎসক বানানোর জন্য নির্যাতন করা অমানবিক। একটি গোলাপগাছকে জবরদস্তি করে আমগাছ বানানোর চেষ্টা করলে শেষ পর্যন্ত দুটিই হারাবেন।

ভালোবাসা হোক শৃঙ্খলের নয়, মুক্তির আলো সন্তান আপনার মাধ্যমে পৃথিবীতে এসেছে, কিন্তু সে আপনার কোনো সম্পত্তি নয়। তাকে মানুষ করার দায়িত্ব আপনার, কিন্তু তাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করার কোনো অধিকার আপনার নেই।

বড় হয়ে অনেক সন্তান যখন তাদের শৈশবের তিক্ত স্মৃতির কথা স্মরণ করে, তখন বাবা-মায়ের প্রতি তাদের মনে ক্ষোভ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। ভালোবাসার সম্পর্ক কখনো ভয়ের চাবুকে গড়ে ওঠে না; তা গড়ে ওঠে পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান ও নিরাপদ আশ্রয়ের ভিত্তিতে।

তাই আজই নিজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলান। সন্তানদের শাসন করার চেয়ে তাদের বন্ধু হয়ে উঠুন। তাদের গল্প শুনুন, তাদের ব্যর্থতাকে গ্রহণ করতে শিখুন। তবেই একটি সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী ও মানসিকভাবে স্বাধীন প্রজন্ম গড়ে উঠবে।

লেখক : করপোরেট প্রশিক্ষক, অর্থ ও ব্যবসায়িক কৌশলবিদ এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর অব প্র‍্যাকটিস।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ