ছবিঃ সংগৃহীত
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, শিক্ষার মান ইত্যাদি নানা সমস্যায় ইউরোপের দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে বিক্ষোভ। সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে ফ্রান্সে। তবে বেলজিয়াম, আলবেনিয়া, ইতালি, পর্তুগাল, স্পেনের মতো দেশগুলোতেই গত শনিবার থেকে একাধিক বিক্ষোভ হতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়িয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। এরই মধ্যে গতকাল রোববার রাতে গণমাধ্যমের অর্থায়ন পরিবর্তনসংক্রান্ত বিতর্কিত বিল পাসের পর চেক প্রজাতন্ত্রেও শুরু হয়েছে বিক্ষোভ।
চেক সরকারের আইনপ্রণেতারা রাতে ভোটাভুটির মাধ্যমে সরকারি গণমাধ্যমের অর্থায়ন সংক্রান্ত পরিবর্তনের খসড়া বিলে প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়ার পর, রাতেই প্রাগের রাজপথে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে, এমন সমালোচনা সত্ত্বেও এই প্রস্তাব পাস করায় এ বিক্ষোভ সৃষ্টি হয়। আয়োজকরা সামনে আরও বিক্ষোভ কর্মসূচির পরিকল্পনা করছেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
গত শুক্রবার হঠাৎ করেই নির্ধারিত সূচির বাইরে এনে নিম্নকক্ষে প্রস্তাবটির প্রথম পাঠ উত্থাপন করা হয়। বিরোধী দল ও গণমাধ্যমবিষয়ক অধিকার সংগঠনগুলো এ আইন দ্রুত পাস করার প্রচেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করেছে। প্রস্তাবিত আইনটি পাস হলে চেক পাবলিক টেলিভিশন এবং রেডিও স্টেশন পরিচালনায় বর্তমানে ব্যবহৃত গৃহস্থালি ফি ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
সরকার চায় চেক টেলিভিশন এবং চেক রেডিওর অর্থায়ন ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় বাজেটের আওতায় নিয়ে আসতে। তবে সমালোচকদের দাবি, এতে সম্প্রচার মাধ্যমগুলো রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। প্রধানমন্ত্রী বাবিসের মতে, এটি অর্থায়নের স্বচ্ছতার বিষয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর কোনো আক্রমণ নয়। বিলটি এখন পরবর্তী চূড়ান্ত ভোটের আগে সংসদীয় কমিটির পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। এদিকে ফ্রান্সে গত শনিবার বিক্ষোভের সময় এক হাজার ৩১৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় সংঘর্ষে ৫৩ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে গতকাল রোববার জানায় দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো অস্থিরতা দেখল ফ্রান্স। আগামী এপ্রিল ও মে মাসে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। দুই মেয়াদের সময়সীমা পূর্ণ হওয়ায় ওই নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর উত্তরসূরি বেছে নেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, শনিবারের বিক্ষোভের সময় পুলিশ ৭৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সামাল দিয়েছে। এ ছাড়া ২৪টি দোকানে লুটপাট চালানো হয়েছে। এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, এসব ঘটনায় বেশ কয়েকটি তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। সংঘর্ষ থেমে যাওয়ার পর শনিবার রাতের বাকি সময় পরিস্থিতি শান্ত ছিল বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
রোববারের বিবৃতিতে বিক্ষোভে কতজন আহত হয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি মন্ত্রণালয়। তবে শনিবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বিক্ষোভকারীদের মধ্যে দুজন গুরুতর আহত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তাদের একজন তুলুজে এবং অন্যজন ক্লেরমঁ-ফেরঁ শহরে আহত হন।
তুলুজের স্থানীয় প্রশাসন বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছে, শহরটিতে ২০ বছর বয়সী এক যুবক গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁর হাতে আঘাত লেগেছে। বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া একজন স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এএফপিকে বলেন, ওই যুবকের ডান হাতের ‘বেশ কয়েকটি আঙুল’ বিস্ফোরণে উড়ে গেছে।
অন্যদিকে ক্লেরমঁ-ফেরঁ অঞ্চলের প্রশাসন জানিয়েছে, সেখানেও এক ব্যক্তির হাতে আঘাত লেগেছে। তবে তাঁর কোনো আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়নি। ফ্রান্সের আঞ্চলিক দৈনিক লা নুভেল রিপাবলিক জানিয়েছে, পোয়াতিয়েতে এক ব্যক্তির বাঁ চোখে আঘাত লেগেছে। সংবাদপত্রটি মুখ চেপে ধরে থাকা এক ব্যক্তির ছবিও প্রকাশ করেছে।
পত্রিকাটির একজন আলোকচিত্রী এএফপিকে জানান, আহত ওই ব্যক্তির বয়স ১৯ বছর। দাঙ্গা পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার সময় তিনি আহত হন।
গত কয়েক সপ্তাহে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের ব্যবহৃত স্টান গ্রেনেড বা কাঁদানে গ্যাসের গ্রেনেডে কয়েকজনের গুরুতর আঘাত পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে শনিবার আহত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব অস্ত্রের কোনোটি ব্যবহার করা হয়েছিল কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অন্তত কয়েকটি ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে।
ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রতিবাদী গোষ্ঠী ও শ্রমিক ইউনিয়ন আগামী শনিবার আবারও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। সরকারকে চাপে রাখতে আন্দোলন চালিয়ে যেতে চায় তারা।
আগামী শনিবার বিক্ষোভ ছাড়াও শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘটের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, বেতন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে মানুষের অসন্তোষ এখন গত মাসে আন্দোলন শুরু করা শিক্ষার্থীদের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হচ্ছে।