ছবিঃ সংগৃহীত
আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত সব শ্রেণির শতভাগ মানসম্মত ও আকর্ষণীয় পাঠ্যবই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। এ কাজের তদারকি করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। উদ্দেশ্য একটাই, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে দেশের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী যেন পরিমার্জিত নতুন বই হাতে পায়।
এনসিটিবির সাম্প্রতিকতম মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে ছাপা আর বাঁধাই প্রায় শতভাগ ছুঁয়েছে। ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তর মিলিয়ে অগ্রগতি ৫৭ শতাংশের বেশি। অষ্টম আর নবম-দশম শ্রেণির চিত্র অবশ্য আলাদা; হাতে গোনা কিছু প্রেসে এসব বইয়ের ছাপা শুরু হলেও বেশির ভাগে এখনো কাজই শুরু হয়নি।
বোর্ড বলছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক দুই স্তরের কাজ একসঙ্গে পেয়েছে এমন প্রেসগুলো প্রাথমিকের বই শেষ করে এখন পুরো গতিতে মাধ্যমিকের বই ছাপছে। সেখানে ইবতেদায়ি এবং ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বইয়ের পরিমাণই বেশি। কয়েকটি ছাপাখানায় অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির বইয়ের ফর্মাও ছাপা হচ্ছে।
এবার সারা দেশে ৬২৩টি লটে পাঠ্যপুস্তক ছাপার কাজ পেয়েছে ১১৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক (ইবতেদায়ি, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি) স্তরে সব মিলিয়ে ৩০ কোটি ৭৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১টি বই ছাপা হবে বলে জানিয়েছে এনসিটিবি। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বইও এই হিসাবের মধ্যে আছে। গত বছরের তুলনায় এবার ছাপার কাজ শুরু হয়েছে এক মাস আগে।
২৮ অক্টোবরের এনসিটিবি প্রতিবেদন বলছে, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকে ছাপার কাজ প্রায় শতভাগ শেষ, যা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সন্তোষজনক। প্রাক-প্রাথমিকে মোট বই ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০টি। এর মধ্যে ছাপা হয়ে গেছে ৫৬ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩টি, অর্থাৎ ৯৮.২১ শতাংশ। প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শন (পিডিআই) সম্পন্ন হয়েছে ৫০ লাখ ৭০ হাজার ২৪০টি বইয়ের, যা ৮৮.৪৮ শতাংশ।
প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি, অর্থাৎ প্রাথমিক স্তরে বইয়ের সংখ্যা ৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৬টি। ছাপা শেষ হয়েছে ৬ কোটি ৬৬ লাখ ২৯ হাজার ১৭৩টির (৮৭.৬৭ শতাংশ)। পিডিআই হয়েছে ৫ কোটি ৯১ লাখ ১৭ হাজার ৮৮৯টির (৭৭.৭৯ শতাংশ)। সব মিলিয়ে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকে গড়ে ৯২.৯৪ শতাংশ বই ছাপা হয়েছে।
মাধ্যমিক স্তরের সঙ্গে একই দরপত্রে আহ্বান করা হয়েছিল ইবতেদায়ির বই। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ইবতেদায়ি বই মোট ৪ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭৪টি; ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত ছাপা হয়েছে ২ কোটি ৬৭ লাখ ১০ হাজার ৭৮৪টি (৬৪.১৫ শতাংশ)। এর মধ্যে পিডিআই হয়েছে ২ কোটি ১২ লাখ ৮১ হাজার ৪২২টির, শতাংশের হিসাবে ৫১.১১।
ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে বই লাগবে ১৭ কোটি ৯৫ লাখ ৪৩ হাজার ১৮টি। এখন পর্যন্ত ছাপা হয়েছে ৯ কোটি ১৮ লাখ ১৭ হাজার ৫৬টি (৫১.১৮ শতাংশ), আর পিডিআই পেরিয়েছে ৬ কোটি ৬৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫টি (৩৭.০৫ শতাংশ)। ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক একসঙ্গে ধরলে গড়ে ৫৭.৬৬ শতাংশ বইয়ের ছাপা শেষ। বইয়ের মান আর ছাপার অগ্রগতি এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এনসিটিবি।
বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলার বক্তব্য, ‘প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের বই ছাপার কাজ ৯০ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয়েছে। ইবতেদায়ি এবং মাধ্যমিকের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির কাজও অর্ধেকের বেশি সম্পন্ন হয়েছে। তবে অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির কাজের গতি কিছুটা কম থাকায় মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। এ স্তরের কয়েকটি লটে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করায় কিছুটা ধীরগতি হয়েছে।’
চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘কাজের গতি কম থাকায় ৩২টি প্রেসকে কারণ দর্শানো হয়েছে। প্রয়োজনে পিছিয়ে থাকা প্রেসগুলোর কাজ বাতিল করে অন্য প্রেসগুলোকে দায়িত্ব দিয়ে কাজ সমন্বয় করা হবে। বইয়ের মান ও লক্ষ্যমাত্রা ঠিক রাখতে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এবং সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একাধিক টিম মাঠপর্যায়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছে।’ সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা মানসম্মত বই পাবে, এমন আশার কথাও জানান তিনি।
এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের সব বই এবং মাধ্যমিকের অর্ধেক বই বিভিন্ন উপজেলায় পাঠানোর কাজ এখন চলছে। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রতিটি উপজেলায় শতভাগ মানসম্মত বই পৌঁছানোই সরকারের লক্ষ্য।
এবার ছাপার পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখা আর বইয়ের মান ধরে রাখার প্রশ্নে কোনো ছাড় দিচ্ছে না শিক্ষা প্রশাসন। রাজধানীসহ দেশের নানা জায়গার প্রেসে ছাপা বই পরখ করতে এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মোট ৫৩টি মনিটরিং টিম মাঠে নেমেছে। মানদণ্ডে উতরাতে না পারায় বিভিন্ন প্রেসের নিম্নমানের ফর্মা ও বই এর মধ্যেই বাতিল হয়েছে।
বোর্ডের মনিটরিং প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানদণ্ড মেনে বিভিন্ন প্রিন্টিং প্রেসের নিম্নমানের ও ত্রুটিপূর্ণ ফর্মা, বই আর কভার বিনাশ (ডিস্ট্রয়) করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৩৬টি প্রেসের ৯ লাখ ফর্মা এবং ১২ হাজার নিম্নমানের ছাপা বই বাতিলের তালিকায় উঠেছে।
বিষয়টি নিয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, ‘এবার বইয়ের মানের বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। গুণগত মান বজায় না থাকায় আমরা সাড়ে ৯ লাখ নিম্নমানের ফর্মা ও ১২ হাজারের মতো বই বাতিল করেছি। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শতভাগ মানসম্মত ও নিখুঁত বই উপজেলায় পৌঁছাতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
একই প্রতিবেদনে মাধ্যমিকের অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপায় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পিছিয়ে থাকার কথা উঠে এসেছে। চুক্তিতে বলা ছিল, ৩ নভেম্বরের মধ্যে এসব শ্রেণির ৫০ শতাংশ বই উপজেলা পর্যায়ে যাবে। অথচ ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, পিছিয়ে পড়া প্রেসগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গতি বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের হাতে যথাসময়ে বই পৌঁছে দিতে রোডম্যাপ অনুযায়ী কাজ চলছে। প্রাথমিক স্তরের বইয়ের কাজ এ মাসের মধ্যেই ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশ সম্পন্ন হবে। আর মাধ্যমিকের বই ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ৯৫ শতাংশের বেশি পৌঁছে যাবে। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকায় মাঠপর্যায়ে বই সরবরাহের কোনো জটিলতা তৈরি হবে না।’
তাঁর ভাষ্য, আগে প্রেসে ও মাঠপর্যায়ে অনিয়মের সুযোগ থেকে যেত। এবার তাই বই বুঝে নেওয়ার সময় মান যাচাইয়ের দায়িত্ব সরাসরি দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের হাতে। বই নেওয়ার পর মানে কোনো ঘাটতি ধরা পড়লে যিনি বই গ্রহণ করেছেন, সেই কর্মকর্তাকেও শাস্তির মুখে পড়তে হবে।
পুরো বিষয় নিয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের মন্তব্য, ‘উপজেলা পর্যায়ে কোনো নিম্নমানের কাগজের বই সরবরাহ বরদাশত করা হবে না। সরকার বাজারদর যাচাই করে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করেছে, যাতে কেউ কম মূল্যের অজুহাতে নিম্নমানের বই তৈরির সুযোগ না পায়। নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত বই সরবরাহে ব্যর্থ হলে এবার কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
২০২৬ শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে যখন মাত্র দুই সপ্তাহের মতো বাকি, তখনো মাধ্যমিকের প্রায় ৬৭ শতাংশ পাঠ্যবই সরবরাহ করা যায়নি। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইয়ের দরপত্র বাতিল করে নতুন দরপত্র ডাকা, অনুমোদন ও চুক্তিতে দেরি এবং কাগজের সংকটকে সে সময় এর কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছিল।
২০২৬ শিক্ষাবর্ষে বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য প্রাথমিকে ৮ কোটি ৫৯ লাখের বেশি এবং মাধ্যমিকে ২১ কোটি ৪৩ লাখের বেশি পাঠ্যবই ছাপা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাধ্যমিকের মোটামুটি ৩৩.০৬ শতাংশ বই সরবরাহ করা গিয়েছিল।