২৯ অক্টোবর ২০২৬ , ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

নিয়োগে বয়স ও সনদ জালিয়াতির অভিযোগ, কুয়েটে কঠোর ব্যবস্থা

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ২৯-১০-২০২৬
নিয়োগে বয়স ও সনদ জালিয়াতির অভিযোগ, কুয়েটে কঠোর ব্যবস্থা ছবিঃ সংগৃহীত

একসঙ্গে সাতজনের চাকরি গেছে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট)। ১১৫তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্তে পাঁচ শিক্ষক, একজন কর্মকর্তা ও একজন কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করেছে কর্তৃপক্ষ। তাঁদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গসহ নানা অভিযোগ ছিল। এর মধ্যে আছে নিয়োগের সময় বয়সে অনিয়ম, অভিজ্ঞতার সনদে অসংগতি, গবেষণাপত্রের অস্তিত্ব না থাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি ভঙ্গ। তদন্ত শেষে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সাতজনই বেশ কিছুদিন ধরে সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় ছিলেন। একই সঙ্গে এতজনের চাকরি যাওয়ায় ক্যাম্পাসে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।

চাকরিচ্যুত শিক্ষকেরা হলেন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. পিন্টু চন্দ্র শীল, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (আইইএম) বিভাগের অধ্যাপক ড. সুব্রত তলাপাত্র, ইএসই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নিবিড় মণ্ডল, মানবিক ও ব্যবসায় বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসরুরা মোস্তফা ও সহকারী অধ্যাপক শাহরিয়ার রোমান। বাকি দুজন ডেপুটি রেজিস্ট্রার নিমাই চন্দ্র মিস্ত্রি এবং অফিস সহায়ক সত্যজিৎ কুমার দত্ত।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সিএসই বিভাগের অধ্যাপক ড. পিন্টু চন্দ্র শীলের বিরুদ্ধে অভিযোগ একটি নয়, একাধিক। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীরা তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা দেন, এরপর তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অভিযোগ আছে, বরখাস্ত অবস্থায় তিনি নিয়মিত ক্যাম্পাসে আসতেন না। দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে তাঁর নাম রয়েছে, যদিও জানা গেছে, এ জন্য কুয়েটের অনুমতি নেওয়া হয়নি। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

অধ্যাপক ড. সুব্রত তলাপাত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ বয়স নিয়ে। ২০১০ সালের ২০ অক্টোবর তিনি কুয়েটে প্রভাষক পদে যোগ দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগবিধি অনুযায়ী প্রভাষক পদে ৩০ বছরের বেশি বয়সী কারও আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগ রয়েছে, আবেদন করার সময়েই তাঁর বয়স ৩০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

মানবিক ও ব্যবসায় বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসরুরা মোস্তফাও নিয়োগবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগের মুখে ছিলেন। প্রভাষক পদে আবেদনের সময় তাঁর বয়স ৩০ বছরের বেশি ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য, সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়ার সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর চাকরির অভিজ্ঞতা গণনায় ধরা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিতে এটি গ্রহণযোগ্য নয়।

নিয়োগের যোগ্যতা আর গবেষণাপত্র নিয়ে অভিযোগ উঠেছে একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহরিয়ার রোমানের বিরুদ্ধে। প্রভাষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে শর্ত ছিল, অনার্স ও মাস্টার্স দুটিতেই প্রথম শ্রেণি থাকতে হবে। অভিযোগ অনুযায়ী, দুটি ডিগ্রিতেই তাঁর ছিল দ্বিতীয় শ্রেণি। দাবি করা হয়েছে, এরপরও জালিয়াতি করে তিনি নিয়োগ পেয়ে যান। এ ছাড়া সহকারী অধ্যাপক পদে আবেদনে তাঁর নামে প্রকাশিত যে দুটি গবেষণাপত্রের কথা বলা হয়েছিল, সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ আছে।

নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ আছে সহকারী অধ্যাপক নিবিড় মণ্ডলের বিরুদ্ধেও। জানা গেছে, যোগ দেওয়ার সময় তিনি প্রকল্পে কাজের অভিজ্ঞতা দেখান, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগবিধি তা স্বীকার করে না। তাঁর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, সাময়িক বরখাস্ত থাকাকালে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তিনি বিদেশে যান, কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফিরে কাজে যোগ দেননি। এসব কারণে তাঁর চাকরি গেছে।

ডেপুটি রেজিস্ট্রার নিমাই চন্দ্র মিস্ত্রি সেকশন অফিসার পদে নিয়োগ পাওয়ার সময় মিথ্যা ও বানোয়াট অভিজ্ঞতার সনদ জমা দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। অফিস সহায়ক সত্যজিৎ কুমার দত্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ, জাতীয় পরিচয়পত্রে বয়স কম দেখিয়ে তিনি চাকরি নেন।

বিভিন্ন সূত্র জানায়, সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর ডেপুটি রেজিস্ট্রার নিমাই চন্দ্র মিস্ত্রি ও শিক্ষক নিবিড় মণ্ডল হাইকোর্টে রিট করেন। তবে কুয়েটের রেজিস্ট্রার কার্যালয় বলছে অন্য কথা। তাদের দাবি, রিটটি অভিযোগ নিয়ে ছিল না; কাউকে ছয় মাসের বেশি সাময়িক বরখাস্ত রাখা যায় কি না, প্রশ্ন ছিল সেটিই।

কুয়েটের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমান ভূঞা গণমাধ্যমকে জানান, ১১৫তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত মেনেই সাতজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অভিযোগ আগে থেকে থাকায় তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। তদন্ত শেষে অনেকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। কেউ জবাব দিয়েছেন, কেউ দেননি। পরে সিন্ডিকেট সভায় সর্বসম্মতিক্রমে পাঁচ শিক্ষক, একজন কর্মকর্তা ও একজন কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত হয়।

প্রেক্ষাপট

২০২৪ সালের ২১ নভেম্বরের সিন্ডিকেট সভায় তদন্ত কমিটির সুপারিশ বিবেচনা করে কুয়েটের সাবেক উপ-উপাচার্যসহ নয়জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির।

এর আগে ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর কুয়েটের ৯৫তম সিন্ডিকেট সভা নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ তুলে পাঁচ শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়। দুই দফায় বরখাস্ত হওয়া এই ব্যক্তিরাই এবার চাকরি হারানো সাতজন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিকে ঘিরে ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কুয়েটে সংঘর্ষ হয়, তাতে আহত হন শতাধিক মানুষ। আন্দোলনের পর সরকার উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যকে অব্যাহতি দেয়।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ