ছবিঃ সংগৃহীত
ব্রিটিশ মঞ্চ ও বড় পর্দার খ্যাতিমান অভিনয়শিল্পী প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট ৮৬ বছর বয়সে মারা গেছেন। শেক্সপিয়রের নাটক এবং সায়েন্স ফিকশন—দুই অঙ্গনেই তিনি সমান খ্যাতি পেয়েছিলেন।
তাঁর দীর্ঘদিনের মুখপাত্র কেলি বুশ নোভাক জানান, বুধবার লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজের বাসভবনে মৃত্যু হয় "স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন" ও "এক্স-মেন"-এর এই তারকার। জীবনের শেষ সময়ে আলঝেইমার্স রোগ ও লেউই বডি ডিমেনশিয়ার সঙ্গে অল্প দিনের এক মর্মস্পর্শী লড়াই করতে হয়েছিল তাঁকে।
১৯৮০-র দশকের শেষ ভাগে পৌঁছাতেই গম্ভীর, রাশভারী কণ্ঠ আর প্রভাবশালী চেহারার স্টুয়ার্ট ব্রিটিশ মঞ্চনাটকে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যান। ৪৭ বছর বয়সে খানিকটা পাকা চুলের ক্যাপ্টেন জঁ-লুক পিকার্ড চরিত্রে তাঁকে নেওয়া হয় 'স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন'-এ। ১৯৬০-এর দশকের সেই যুগান্তকারী টিভি সিরিজের প্রথম লাইভ-অ্যাকশন স্পিন-অফ ছিল এটি। স্টারশিপ এন্টারপ্রাইজের অধিনায়ক হিসেবে তাঁর মাপা অভিনয় আর দৃঢ় নির্দেশ—"এনগেজ!" (চালিয়ে যাও), "মেক ইট সো" (এমনটাই হোক)—সাত মৌসুমে তাঁকে বিশ্বমানের তারকা করে তোলে।
বিখ্যাত চরিত্রটিতে চারটি ফিচার ফিল্ম স্পিন-অফেও ফিরেছিলেন স্টুয়ার্ট—'স্টার ট্রেক জেনারেশনস' (১৯৯৪), 'স্টার ট্রেক: ফার্স্ট কন্টাক্ট' (১৯৯৬), 'স্টার ট্রেক: ইনসারেকশন' (১৯৯৮) ও 'স্টার ট্রেক: নেমেসিস' (২০০২)। ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত চলা টিভি সিরিজ 'স্টার ট্রেক: পিকার্ড'-এও তিনি ছিলেন।
শেক্সপিয়রীয় নাটকে তাঁর সহ-অভিনেতা, 'এক্স-মেন' সিরিজের সহ-তারকা ও দীর্ঘদিনের বন্ধু ইয়ান ম্যাককেলেনের চোখে স্টুয়ার্ট ছিলেন "আটলান্টিকের উভয় পাড়েই (যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র) তার প্রজন্মের সবচেয়ে সম্মানিত ও ভালোবাসাধন্য অভিনেতা"।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ম্যাককেলেন লেখেন, 'অন্য সব পরিচয়ের আগে, প্যাট্রিকের বড় পরিচয় ছিল তিনি উত্তর ইংল্যান্ডের গর্বিত কাউন্টি ইয়র্কশায়ারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং সেখানেই বেড়ে উঠেছিলেন—যাকে তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গভীরভাবে ভালোবাসতেন। তার আঞ্চলিক টানের কণ্ঠে এবং তার চিন্তা ও অনুভূতি স্পষ্ট ও সৎভাবে ব্যক্ত করার ভঙ্গিতেই আপনি তা শুনতে পেতেন। ইয়র্কশায়ারের মানুষ আধা-সত্য কিংবা বড় সমস্যা এড়িয়ে চলা বরদাশত করে না। তিনি সবসময় নিজের অনুভূতি খোলাখুলি প্রকাশ করতেন, আর এটিই তাকে এমন এক মানুষে পরিণত করেছিল যার ওপর ভরসা করা যায়, যাকে শ্রদ্ধা করা যায় এবং আমার ক্ষেত্রে—যাকে ভালোবাসাও যায়।'
সোশ্যাল মিডিয়ায় শ্রদ্ধা জানিয়েছেন 'স্টার ট্রেক'-এর সহ-অভিনেতা উইলিয়াম শ্যাটনারও। তাঁর লেখা: 'মঞ্চ থেকে এন্টারপ্রাইজের ব্রিজ পর্যন্ত—তিনি তার সমস্ত কাজে বুদ্ধিমত্তা, রুচিশীলতা এবং মানবতার গভীর অনুভূতি নিয়ে এসেছিলেন। ক্যাপ্টেন পিকার্ড আমাদের মধ্যকার সেরা দিকগুলোর প্রতিনিধিত্ব করতেন, আর যে মানুষটি এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনিও তাই ছিলেন। তার ও তার অভিনীত কাজের প্রতি আমার হৃদয় গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় পরিপূর্ণ।'
মূল সিরিজে হিকারু সুলু হয়েছিলেন জর্জ তাকেই। 'ব্লুস্কাই'-এ তিনি স্টুয়ার্ট সম্পর্কে লিখেছেন, 'তিনি তারকামণ্ডলীর দিকে তাকিয়ে থাকা নতুন একটি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন, যারা সমগ্র মানবজাতির জন্য এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। আমাদের হৃদয় সত্যিই ভারাক্রান্ত। স্বর্গে শান্তিতে থাকুন, ক্যাপ্টেন।'
স্টুয়ার্টের আরেকটি জনপ্রিয় চরিত্র 'এক্স-মেন' সিরিজের প্রফেসর চার্লস জেভিয়ার। স্টার ট্রেকের পর একই ধাঁচের চরিত্রে আটকে পড়ায় (টাইপকাস্ট) কাজ পাওয়া কিছুটা কঠিন হয়েছিল, তবু ২০০০ সালের 'এক্স-মেন' ছবিতে পরিচালক ব্রায়ান সিংগারের সঙ্গে কাজের প্রস্তাবে তিনি আগ্রহী হন।
এরপর সাতটি চলচ্চিত্রে চরিত্রটি করেন তিনি; এই ডিসেম্বরে মুক্তির কথা থাকা 'অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে'-তেও আবার এ ভূমিকায় তাঁকে দেখা যাবে।
'এক্স-মেন'-এর সহ-তারকা হিউ জ্যাকম্যান ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, 'আজ আমরা মঞ্চ ও পর্দার অন্যতম মহান এক শিল্পীকে হারালাম। আর আমার কাছে তিনি ছিলেন একজন দারুণ বন্ধু ও অসাধারণ মানুষ। আমি তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট, জীবনের বাকি দিনগুলোতে আমি আপনাকে খুব মিস করব।'
ইংল্যান্ডের মিরফিল্ড নামে ছোট এক শিল্পঘন গ্রামে ১৯৪০ সালের ১৩ জুলাই জন্ম স্টুয়ার্টের। বাবা আলফ্রেড স্টুয়ার্ট ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা, পরে আধা-দক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন; মা গ্ল্যাডিস স্টুয়ার্ট ছিলেন পোশাক কারখানার বয়নশিল্পী। তিন ভাইয়ের সবার ছোট ছিলেন তিনি। গরম পানির ব্যবস্থাহীন একটি ছোট ঘরে কেটেছে শৈশব। বাবার মদ্যপান আর পারিবারিক সহিংসতায় সময়টা ছিল তাঁর কাছে অতিষ্ঠ। ২০০৯ সালে দ্য গার্ডিয়ান-এ লেখা এক প্রবন্ধে একে তিনি "প্রায় অসহনীয়" বলেছিলেন।
স্বস্তির জায়গা হয়ে উঠেছিল অভিনয়। প্রথমে স্কুলে—১২ বছর বয়সে ইংরেজির শিক্ষক তাঁকে শেক্সপিয়রের 'দ্য মার্চেন্ট অফ ভেনিস'-এ শাইলকের ভূমিকা দেন—পরে স্থানীয় নাট্যদলে। তিনি লিখেছিলেন, 'আমি অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নিজের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিলাম। বাড়িতে যেসব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমাকে যেতে হতো, তার চেয়ে মঞ্চ আমার কাছে অনেক বেশি নিরাপদ স্থান ছিল—এটি আমাকে বাস্তব জীবন থেকে পালানোর একটা উপায় তৈরি করে দিয়েছিল। আমি অন্য কোনো স্থানে, অন্য কোনো সময়ে, অন্য একজন মানুষ হয়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছিলাম।'
মাধ্যমিক শেষ করেন ১৫ বছর বয়সে। এরপর কাজ করেন স্থানীয় এক রিপোর্টার ও আসবাবপত্রের বিক্রয়কর্মী হিসেবে। পরে স্থানীয় আর্টস কাউন্সিলের অর্থসহায়তায় তিনি মর্যাদাপূর্ণ 'ব্রিস্টল ওল্ড ভিক থিয়েটার স্কুল'-এ পড়ার সুযোগ পান; ১৯৫৭ সালে, ১৭ বছর বয়সে, সেখানে ভর্তি হন।
ইয়র্কশায়ারের আঞ্চলিক টান ঝেড়ে ফেলার দুই বছর পর প্রথম পেশাদার মঞ্চনাটকে অভিনয় করেন স্টুয়ার্ট। ১৯৬৬ সালে যোগ দেন 'রয়েল শেকসপিয়র কোম্পানি'-তে। সেখানকার ১৬ বছরে নিজের যুগের অন্যতম সেরা নাট্যাভিনেতার পরিচিতি পান তিনি, নতুন দর্শকের কাছে শেক্সপিয়রকে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমও হয়ে ওঠেন। এক বন্ধুর আমন্ত্রণে লস অ্যাঞ্জেলেসে শেক্সপিয়রের ওপর মাস্টারক্লাস নিচ্ছিলেন তিনি, তখনই 'স্টার ট্রেক'-এর একজন টিভি কাস্টিং ডিরেক্টর তাঁকে লক্ষ করেন।
দীর্ঘ পথচলায় শেক্সপিয়রের বহু কালজয়ী চরিত্র করেছেন স্টুয়ার্ট, যার মধ্যে আছে ম্যাকবেথ, ওথেলো, প্রোসপেরো, শাইলক ও মার্ক অ্যান্টনি। লরেন্স অলিভিয়ার পুরস্কার পেয়েছেন দুবার—১৯৭৯ সালে 'অ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা' ও ২০০৯ সালে 'হ্যামলেট'-এর জন্য। শিশুদের কথাভিত্তিক অ্যালবাম 'প্রোকোফিয়েভ: পিটার অ্যান্ড দ্য উলফ' তাঁকে ১৯৯৬ সালে একটি গ্র্যামি এনে দেয়। একটি টনি এবং চারটি এমির মনোনয়নও ছিল তাঁর ঝুলিতে।
মঞ্চে শেষ বড় কাজ ২০১৬ সালে; লন্ডনের উইন্ডহ্যাম থিয়েটারে হ্যারল্ড পিন্টারের 'নো ম্যানস ল্যান্ড'-এ তিনি হয়েছিলেন হার্স্ট। আত্মজীবনী 'মেকিং ইট সো' বের হয় ২০২৩ সালে।
শৈশব থেকেই হাডার্সফিল্ড টাউন ফুটবল ক্লাবের অন্ধ ভক্ত ছিলেন স্টুয়ার্ট; ২০২৪ সালেও গ্যালারিতে বসে দলের জন্য গলা ফাটাতে দেখা গেছে তাঁকে। ক্লাবটির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে এক পোস্টে তাঁকে "তার শিল্পের এক মহান বটবৃক্ষ এবং বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের লেজেন্ড ও হিরো" বলা হয়েছে।
তিনবার বিয়ে করেন স্টুয়ার্ট। প্রথম স্ত্রী থিয়েটার কোরিওগ্রাফার শীলা ফ্যালকনার (১৯৬৬ থেকে ১৯৯০); সে সংসারে দুই সন্তান—সহ-অভিনেতা ড্যানিয়েল ও সোফি। দ্বিতীয় স্ত্রী 'স্টার ট্রেক'-এর প্রযোজক ওয়েন্ডি নিউস (২০০০ থেকে ২০০৩)। ২০১৩ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জীবনসঙ্গী ছিলেন জ্যাজ সংগীতশিল্পী সানি ওজেল। ২০১৩ সালে রিহার্সাল শেষে এই বিয়ে পড়ান বন্ধু ও সহকর্মী ইয়ান ম্যাককেলেন, যাঁর সঙ্গে সে বছর দুটি ব্রডওয়ে প্রযোজনায় অভিনয় করেছিলেন স্টুয়ার্ট।
২০২৩ সালে দ্য গার্ডিয়ান-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, 'আমার মনে হয় আমি দীর্ঘ সময় ধরে নিজের জীবনের বাস্তবতা অস্বীকার করে আসছিলাম। আমি কখনোই অনুধাবন করতে পারিনি যে আমি কতটা সফল হয়ে উঠেছি।'