ছবিঃ সংগৃহীত
মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা প্রয়োগে প্রথম বড় রাজনৈতিক লাগাম টানতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটরা। তাদের সম্ভাব্য বড় জয় ঠেকাতে শেষ মুহূর্তে জোরালো প্রচারণায় নেমেছে রিপাবলিকান পার্টি।
বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
জনমত জরিপ বলছে, প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের হাত থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেওয়ার দৌড়ে ডেমোক্র্যাটরা অনেকখানি এগিয়ে। সিনেটেও দলটির সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সুযোগ আছে।
তবু ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে উদ্বেগ রয়ে গেছে। এক দশক ধরে রাজনৈতিক প্রতিকূলতা সামলে এগিয়ে চলা ট্রাম্পের অবস্থান এবং তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের গত দুই বছরের কর্মকাণ্ডই এর পেছনে।
দলের বর্তমান মনোভাব বোঝাতে সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর রাফায়েল ওয়ারনক বলেন, ‘আমরা আশাবাদী, তবে একই সঙ্গে উদ্বেগেও রয়েছি।’
রোববার মিশিগানে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরের বিরোধ পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনী অঙ্গরাজ্যে একজন ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসওম্যান দল ছেড়ে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন দিয়েছেন। এতে চাপে পড়েছে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের প্রচারণা।
তবে সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের ধারণা, ডেমোক্র্যাটদের প্রতি সমর্থন বাড়ছে।
রিপাবলিকানদের শেষ মুহূর্তের প্রচারণার নেতৃত্বে আছেন খোদ ট্রাম্প। আইওয়া ও কানসাসে তিনি দলের প্রার্থীদের পক্ষে সমাবেশ করেছেন। এসব অঙ্গরাজ্যে সাধারণত রিপাবলিকানদের জেতার সম্ভাবনা থাকে বলে সেখানে প্রেসিডেন্টের বিশেষ প্রচারণার দরকার পড়ার কথা নয়।
সমাবেশগুলোতে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ডেমোক্র্যাটরা যুক্তরাষ্ট্রকে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র করছে। একই সঙ্গে তাঁর দল জিতলে দেশের প্রত্যেক নাগরিককে পাঁচ হাজার ডলার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
আইওয়ার সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা জিতব।’ ডেমোক্র্যাটদের তিনি ‘চরমপন্থী ও বিপজ্জনক উগ্রবাদী’ আখ্যা দেন। তাঁর অভিযোগ, ডেমোক্র্যাটরা মানুষের সম্পদ কেড়ে নেবে এবং অভিবাসীদের দেশে ঢুকতে দিয়ে ‘লুটপাট, ধর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞ’ চালানোর সুযোগ করে দেবে।
অন্যদিকে নানা জনমত জরিপে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের অসন্তোষ ফুটে উঠেছে।
রোববার প্রকাশিত এনবিসি নিউজের জরিপ অনুযায়ী, ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ জানিয়েছেন। বিশেষ করে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন। আট মাস ধরে ইরানের বিরুদ্ধে চলা যুদ্ধও মূল্যস্ফীতি বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
মূল ভোট মঙ্গলবার হলেও আগাম ভোটেই এরই মধ্যে রেকর্ড ৫ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ভোট দিয়েছেন। নজিরবিহীন এই অংশগ্রহণকে দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নির্বাচন ঘিরে আগ্রহের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিয়াল ক্ষমতার পরিধি ক্রমেই বেড়েছে, আর তাতে রিপাবলিকান পার্টির ক্রমবর্ধমান সমর্থনও সহায়ক হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের একাংশ ভেঙে বলরুম তৈরি, মুদ্রা ও সরকারি ভবনে নিজের ছবি জুড়ে দেওয়া, ব্যাপক শুল্ক বসিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি এবং কানাডা ও গ্রিনল্যান্ডের মতো মিত্র অঞ্চল দখল বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জুড়ে নেওয়ার হুমকিসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন ট্রাম্প।
ডেমোক্র্যাটরা বড় ব্যবধানে জিতলে শুরু হয়ে যেতে পারে ট্রাম্প-পরবর্তী রাজনৈতিক যুগ। পাশাপাশি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে নতুন নেতৃত্বের প্রতিযোগিতাও দানা বাঁধতে পারে।
প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেটের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোর নেতৃত্বও যাবে ডেমোক্র্যাটদের হাতে। এসব কমিটির মাধ্যমে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ এবং কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কসহ নানা বিতর্কিত বিষয়ে তদন্তের পথ খুলবে।
তবে সিনেট কার নিয়ন্ত্রণে যাবে, সেটি এখনো অনিশ্চিত।
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটের ১০০টি আসনের মাত্র এক-তৃতীয়াংশে ভোট হচ্ছে, যার বেশির ভাগ আসনকেই ডেমোক্র্যাটদের জন্য অনুকূল ধরা হয়নি। কিন্তু টেক্সাস ও কানসাসের মতো ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-সমর্থিত অঙ্গরাজ্যেও ডেমোক্র্যাটরা জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলায় নির্বাচন বিশ্লেষকেরা এখন দুই দলের লড়াইকে প্রায় সমানে সমান দেখছেন।
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সুপ্রিম কোর্টসহ বিভিন্ন আদালতে ট্রাম্পের দীর্ঘমেয়াদি বিচারক নিয়োগ আটকে দিতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা।
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিজ্ঞাপনের পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশ জুগিয়েছেন বিপুল সম্পদের মালিক ব্যক্তিগত দাতারা।
রিপাবলিকান প্রার্থীদের জেতাতে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইলন মাস্ক প্রায় ৫০ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছেন। এর আগে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগে কথিত ‘ডিওজিই’ (ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি) কর্মসূচির নেতৃত্বেও ছিলেন তিনি।
প্রচারণায় ট্রাম্পের নেতৃত্বে কড়া আক্রমণাত্মক বক্তব্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণও চোখে পড়েছে। ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে তিনি ভেগান থেকে জিহাদি পর্যন্ত নানা ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ এনেছেন।
তবে নির্বাচন ঘিরে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তাগুলোর একটি হলো—হেরে গেলে রিপাবলিকানরা ফল মেনে নেবে কি না; এ নিয়ে সাংবিধানিক সংকটের আশঙ্কাও রয়েছে।
২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হারের ফল উল্টে দিতে ট্রাম্প যে চেষ্টা চালিয়েছিলেন, তেমন পরিস্থিতি আবার তৈরি হতে পারে বলে অনেকের আশঙ্কা।
এদিকে আলাস্কায় ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রার্থীর সম্ভাব্য জয় আটকাতে ট্রাম্প প্রশাসনের একটি ব্যতিক্রমী আবেদন রোববার খারিজ করে দিয়েছেন ফেডারেল আদালতের এক বিচারক।
মামলায় দাবি করা হয়েছিল, রিপাবলিকান বর্তমান সিনেটর ড্যান সুলিভানকে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী মেরি পেলটোলা হারালে সেই ফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেওয়া যাবে না। যুক্তি ছিল, ড্যান সুলিভান নামে আরও একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। অভিযোগ তোলা হয়, রিপাবলিকান প্রার্থীর ভোট ভাগ করতেই ডেমোক্র্যাটরা ওই প্রার্থীকে দাঁড় করিয়েছে।