ছবিঃ সংগৃহীত
নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক আর কেলেঙ্কারির অভিযোগ থাকলেও আলাস্কার বেশির ভাগ ভোটারকে তা নিয়ে তেমন উদ্বিগ্ন দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দিতে সোমবার সকালে রাজ্যের বৃহত্তম শহর অ্যাঙ্কোরেজে ভোটারদের লম্বা সারি চোখে পড়ে।
অভিযোগটি উঠেছে সিনেট নির্বাচনের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলার বিরুদ্ধে—একই নামের আরেকজনকে প্রার্থী বানিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান দলীয় বর্তমান সিনেটর ড্যান সুলিভানের ভোট কমানোর চেষ্টার। ওয়াশিংটনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা ঠিক করতে এই লড়াই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অ্যাঙ্কোরেজ থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর দিয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, হিমাঙ্কের কাছাকাছি তাপমাত্রার মধ্যেও অ্যাঙ্কোরেজের ভোটকেন্দ্রে আসা মানুষের খুব সামান্য অংশকেই অভিযোগটি নিয়ে চিন্তিত মনে হয়েছে।
হাজার হাজার মাইল দূরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি ব্যাপক আলোড়ন তুললেও আলাস্কার ভোটারদের মধ্যে তেমন সাড়া মেলেনি। রাজ্যটির ভোটার ডেল ব্রাউনের প্রতিক্রিয়া ছিল সংক্ষিপ্ত: ‘কে পরোয়া করে?’
২৫ বছর বয়সী এই কাঠমিস্ত্রির চোখে অন্য নামের প্রার্থী দাঁড় করানোর কৌশল ‘অনৈতিক’, তবে তাঁর মতে, ‘এটি বেআইনি নয়।’ তিনি মনে করিয়ে দেন, নামসর্বস্ব প্রার্থী দাঁড় করানোর এই একই কৌশল ২০২০ সালে ফ্লোরিডার সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকানরাও নিয়েছিল।
স্বতন্ত্র ভোটার ব্রাউন এএফপিকে বলেন, ‘আমেরিকার রাজনীতি এখন পুরোপুরি মিথ্যার এক প্রহসনে পরিণত হয়েছে।’ তাঁর আরও মন্তব্য, ‘আমার মনে হয়, নৈতিকতা বলতে যা বোঝায়, তা অনেক আগেই হারিয়ে গেছে।’
তবে বিতর্কটি তাঁর ভোটের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলেনি—তিনি ভোট দিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলের মূল্যস্ফীতিকে বিরক্তিকর বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এ গুরুত্বপূর্ণ আসনে হারলে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হাতছাড়া হতে পারে ট্রাম্পের দলের, তাই আলাস্কায় নির্বাচনী উত্তেজনা তীব্র। অ্যাঙ্কোরেজে প্রতিবেশীদের বাড়ির বেড়ার দুই পাশে দেখা যাচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রচারপত্র ও সাইনবোর্ড।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই নামের আরেক প্রার্থী দাঁড় করানোর পরিকল্পনায় সহায়তা করেছে পেলটোলার নির্বাচনী প্রচারশিবিরই। পেলটোলা অবশ্য দাবি করেছেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানতেন না।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর আগেভাগেই নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করার উদ্যোগ নেন ট্রাম্প। রোববার এক ফেডারেল বিচারক সে আবেদন খারিজ করে দিলেও ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ অব্যাহত আছে। ফেডারেল কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে ঘটনাটির ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে, যদিও তদন্তের আইনি ভিত্তি কী—সে বিষয়ে কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তারা।
বরফে ঢাকা পাহাড়ের দৃশ্য দেখা যায় এমন একটি বিপণিবিতানের ভোটকেন্দ্রে এসেছিলেন রে হার্ট। ব্যালটে একই নামের দুজন ড্যান সুলিভান থাকায় ভোটারদের মধ্যে ‘বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে’ বলে স্বীকার করেন তিনি। তবে রিপাবলিকান দলের এ ভোটারের ধারণা, প্রতারণার এ কৌশলে খুব কম মানুষই বিভ্রান্ত হয়েছেন।
৩৭ বছর বয়সী অপরাধ তদন্তকারী হার্টের ভাষ্য, ‘আমি ভোটারদের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনকে বলতে শুনেছি, সঠিক ড্যান সুলিভানকে ভোট দিতে ভুলবেন না।’
এএফপির সঙ্গে কথা বলা আলাস্কার অনেক ভোটার জানান, বিতর্কিত এ নির্বাচন নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তাঁরা প্রচারপত্র, বিজ্ঞাপন ও ডাকযোগে নানা ধরনের বার্তা পেয়েছেন।
অবশ্য ব্যালটে দুই সুলিভানকে আলাদা করে চেনা সহজ। সিনেটর ড্যান সুলিভানের নামের পাশে ‘নিবন্ধিত রিপাবলিকান’ ও ‘বর্তমান সিনেটর’ পরিচয় লেখা আছে, আর ড্যানিয়েল জে. সুলিভান জুনিয়রের নামের পাশে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। ট্রাম্প তাঁকে ‘ভুয়া’ সুলিভান বলে অভিহিত করেছেন।
ভোটারদের প্রশ্নের জবাব দিতে ভোটকর্মীরাও আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি ভোটকেন্দ্রের স্বেচ্ছাসেবক বলেন, ‘মনে হচ্ছে, বিষয়টি ভোটারদের কাছে বেশ স্পষ্ট।’
ব্যালটে আসল প্রার্থী কে, তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে বলে মনে করেন বিমান সংস্থার পাইলট লুক ক্লেমেন্টও। তবে ৪৭ বছর বয়সী ক্লেমেন্টের আক্ষেপ, এবারের নির্বাচনী প্রচার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার বদলে কাদা ছোড়াছুড়িতে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকায় তিনি বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। ক্লেমেন্টের মতে, অন্য মার্কিন নাগরিকদের চেয়ে আলাস্কার মানুষ মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি অনুভব করছেন, কারণ রাজ্যটির ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ‘সবকিছু বাইরে থেকে আনতে হয় এবং সবকিছুই জ্বালানির দামের ওপর নির্ভরশীল।’
সারিতে দাঁড়ানো অন্য ভোটারদের আলাপে উঠে আসে অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে স্যামন মাছ কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং রাজ্যের বিপুল তেলসম্পদ কতটা কাজে লাগানো উচিত—এমন নানা প্রসঙ্গ।