০৬ নভেম্বর ২০২৬ , ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬

২ থেকে ৩টি তীব্র শৈত্যপ্রবাহের শঙ্কা, তবু এবার ‘উষ্ণ শীতকাল’-এর আভাস

বিশেষ প্রতিনিধি
আপলোড সময় : ০৬-১১-২০২৬
২ থেকে ৩টি তীব্র শৈত্যপ্রবাহের শঙ্কা, তবু এবার ‘উষ্ণ শীতকাল’-এর আভাস ছবিঃ সংগৃহীত

মাঝরাতে ফ্যানের গতি কমিয়ে দেওয়া কিংবা শেষরাতে গায়ে টেনে নেওয়া কাঁথাই বলে দিচ্ছে, শীত এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়—যদিও দিনের রোদের তেজ এখনো তেমন কমেনি। ইট-কংক্রিটের শহরে শীতের আগমন কিছুটা ধীরে টের পাওয়া গেলেও উত্তরের গ্রামগুলোতে হিমেল হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সেখানকার খোলা প্রান্তর আর নদীর পাড় এরই মধ্যে ঢেকে যেতে শুরু করেছে ভোরের কোমল কুয়াশায়।

প্রকৃতির এমন নিঃশব্দ পালাবদলের মধ্যেই শীত নিয়ে বড় খবর দিল আবহাওয়া অধিদপ্তর: আগামী ৩ মাসে দেশের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের ৪ থেকে ৬টি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।

নভেম্বর থেকে আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ের জন্য দেওয়া এই দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস অনুযায়ী, শীত মৌসুমে কয়েক দফায় শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে। কুয়াশা, লঘুচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনার কথাও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

পূর্বাভাসটিতে সই করেছেন অধিদপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) এবং দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান মো. মমিনুল ইসলাম। এতে বলা হয়েছে, চলতি নভেম্বর থেকে জানুয়ারি—এই তিন মাসে দেশে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের ৪ থেকে ৬টি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে, যার ২ থেকে ৩টি তীব্র রূপ নিতে পারে।

অধিদপ্তরের সংজ্ঞা অনুযায়ী, তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে থাকলে সেটি মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে থাকলে মাঝারি, আর ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রির নিচে নামলে তাকে বলা হয় অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ।

কখন, কোথায় শৈত্যপ্রবাহ বেশি হতে পারে—এ প্রশ্নে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বাসসকে বলেন, সাধারণত ডিসেম্বরে এক থেকে দুটি মৃদু শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে। দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে, অর্থাৎ রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামতে পারে, আর সেসব জায়গায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে।

তিনি আরও জানান, জানুয়ারিতে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা আছে। তখন মাঝেমধ্যে এক বা দুটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহও হতে পারে, যাতে তাপমাত্রা থাকবে ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে।

এই তিন মাস শেষরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের কোনো কোনো জায়গায় এবং নদ-নদীর অববাহিকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে; দেশের বাকি এলাকায় কুয়াশা থাকতে পারে হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার।

পূর্বাভাসে উল্লেখ আছে, ঘন কুয়াশায় দিন ও রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান কমে যেতে পারে, ফলে শীত বেশি অনুভূত হতে পারে। তবে সব মিলিয়ে এ সময় দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে।

এর পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এল নিনো সক্রিয় থাকায় এবং পৃথিবী উষ্ণ হয়ে থাকায় বাংলাদেশেও তার ছোঁয়া লেগেছে; শুধু তা-ই নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই এর প্রভাব থাকবে। এ কারণে গড় তাপমাত্রা কিছুটা বেশি থাকবে, আর সে জন্যই এবারের শীতকালে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকবে বলে তাঁরা বলছেন। তবে মাঝেমধ্যে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নেমে শৈত্যপ্রবাহ হবে বলেও জানান তিনি।

তাঁর কথায়, শৈত্যপ্রবাহ হবে ঠিকই, তবে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহের দিনক্ষণ, সংখ্যা ও ব্যাপ্তি অনেকটাই কম থাকবে—সে কারণেই এবারের শীতকাল কিছুটা ‘উষ্ণ’ থাকতে পারে বলে তাঁরা বলছেন।

এল নিনো সক্রিয় থাকায় শৈত্যপ্রবাহ কত দিন থাকবে বা কতবার আসবে, তা নিয়ে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি, আর সে কারণে সতর্ক থাকার কথা বলেন। তবে সার্বিকভাবে এবার খানিকটা ‘উষ্ণ শীতকাল’ পাওয়া যাবে বলে তাঁরা আশা করছেন বলে জানান এই আবহাওয়াবিদ।

শীতের বাইরে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনার কথাও পূর্বাভাসে রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আগামী তিন মাসে বঙ্গোপসাগরে ২ থেকে ৪টি লঘুচাপ তৈরি হতে পারে, যার এক থেকে দুটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে।

এ বিষয়ে ড. আবুল কালাম মল্লিক বাসসকে জানান, বাংলাদেশে অক্টোবর ও নভেম্বর ঘূর্ণিঝড়প্রবণ মাস; প্রতিবছর এ সময় লঘুচাপ সৃষ্টি হয়, আর কখনো কখনো তা শক্তি সঞ্চয় করে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, এ সময় সূর্যের দক্ষিণায়ন চলে। দিন ধীরে ধীরে ছোট আর রাত বড় হতে থাকে, এবং বঙ্গোপসাগর বরাবর সূর্যের আলো বেশি পাওয়া যায়, ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যায়।

এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও সব বছর ঘটে না, মাঝেমধ্যে ঘটে—তাই একে ট্রানজিয়েন্ট (ক্ষণস্থায়ী) সিস্টেম বলা হয় বলে জানান তিনি।

বৃষ্টিপাত প্রসঙ্গে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এই তিন মাসে দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বিভাগওয়ারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, নভেম্বরে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হতে পারে চট্টগ্রাম বিভাগে—৩৫ থেকে ৪০ মিলিমিটার। বরিশাল বিভাগে ৩০ থেকে ৪০ মিলিমিটার, ঢাকা, সিলেট ও খুলনা বিভাগে ১৫ থেকে ২৫ মিলিমিটার, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার এবং রংপুর বিভাগে ৪ থেকে ৮ মিলিমিটার বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে বৃষ্টি আরও কমে আসবে। ডিসেম্বরে ঢাকা বিভাগে ৮ থেকে ১০ মিলিমিটার ও সিলেট বিভাগে ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার, আর জানুয়ারিতে খুলনা বিভাগে ১০ থেকে ১৪ মিলিমিটার ও ঢাকাসহ অন্য বিভাগগুলোতে ৬ থেকে ১০ মিলিমিটারের মধ্যে বৃষ্টি হতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, আবহাওয়ার নানা উপাত্ত, ঊর্ধ্বাকাশের আবহাওয়া বিন্যাস, জলবায়ু মডেল এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা অনুমোদিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের মডেল পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে এই পূর্বাভাস তৈরি হয়েছে। বিবেচনায় রাখা হয়েছে এল নিনো ও লা নিনা পরিস্থিতিও।

দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস তৈরির প্রক্রিয়া বোঝাতে গিয়ে ড. মল্লিক বলেন, ১৯৪৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অক্টোবর ও নভেম্বরে বঙ্গোপসাগরে কতগুলো লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে, সে তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ সময়ে গড়ে এক থেকে তিনটি লঘুচাপ থাকে, যার কোনো কোনোটি মাঝেমধ্যে শক্তি সঞ্চয় করে। দীর্ঘ সময়ের এমন গড় চিত্রের ওপর ভিত্তি করেই দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস দেওয়া হয়।

তবে এমন পূর্বাভাসে অনিশ্চয়তার মাত্রা অনেক বেশি থাকে—এ কথা মনে করিয়ে দিয়ে এই আবহাওয়াবিদ দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসের পাশাপাশি নিয়মিত দৈনন্দিন পূর্বাভাসকেও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন।

এদিকে গত অক্টোবরে দেশে বৃষ্টি হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে ৬৮ শতাংশ কম। ওই মাসে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৭.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয় সিলেটে, ১৭ অক্টোবর; সর্বনিম্ন ১৫.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়, ২৭ অক্টোবর। গত মাসে দেশের সর্বোচ্চ, সর্বনিম্ন ও গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল যথাক্রমে ১.৮, ০.৪ ও ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ