০৫ অক্টোবর ২০২৬ , ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

যেভাবে বিদায় হজের পটভূমি তৈরি হয়

বিশেষ প্রতিনিধি
আপলোড সময় : ১৯-০৫-২০২৬
যেভাবে বিদায় হজের পটভূমি তৈরি হয় সংগৃহীত ছবি

হিজরতের নবম বছরে আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হজ ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই হজের মাধ্যমে কাবাঘর ও হজের আনুষ্ঠানিকতা থেকে জাহেলিয়াত ও শিরকি প্রথার অবশিষ্ট চিহ্নগুলো চূড়ান্তভাবে অপসারণের ঘোষণা দেওয়া হয়।

 
ঘোষণা দেওয়া হয়, এই বছরের পর আর কোনো মুশরিক হজ করতে পারবে না এবং কেউ নগ্ন অবস্থায় কাবা তাওয়াফ করতে পারবে না। (বুখারি, হাদিস : ৪৬৫৫)

মূলত নবম হিজরিতে আবু বকর (রা.)-এর নেতৃত্বে এই ঐতিহাসিক হজই দশম হিজরির বিদায় হজের পরিবেশ ও পটভূমি প্রস্তুত করে দেয়। ফলে হিজরতের দশম বছরে মহানবী (সা.) যখন বিদায় হজ পালন করেন, তখন পবিত্র কাবা ও হজের সব আনুষ্ঠানিকতা

সম্পূর্ণরূপে মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত হয়ে যায়। এই ঘোষণাই মূলত হজের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে।

 
এর মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা হয় যে পরবর্তী বছরগুলোতে মুশরিকদের জন্য হজে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ এবং জাহেলিয়াত যুগের নগ্ন তাওয়াফের লজ্জাজনক প্রথা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত। কারণ এই প্রথা কাবাঘরের পবিত্রতা, শালীনতা ও ইবাদতের মর্যাদার সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন বর্ণনায় আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ পাওয়া যায়। আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) বলেন, ‘আমাকে চারটি বিষয় ঘোষণা করার জন্য পাঠানো হয়েছিল—এক. কেউ যেন নগ্ন অবস্থায় কাবা তাওয়াফ না করে, দুই. যার সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর চুক্তি হয়েছে, তা নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত বহাল থাকবে, তিন. শুধু ঈমানদাররাই জান্নাতে প্রবেশ করবে, চার. এই বছরের পর কোনো মুশরিক হজ করতে পারবে না।’

 

এই ঘোষণাগুলোর মাধ্যমে ইসলামের পবিত্র ইবাদতগুলোকে শিরক ও জাহেলিয়াতের সব অপসংস্কার থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করা হয় এবং হজকে তাওহিদভিত্তিক বিশুদ্ধ ইবাদত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

আবু বকর (রা.)-এর ঐতিহাসিক যাত্রা

তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে মহানবী (সা.) রমজান, শাওয়াল ও যুলক্বদা মাসের অবশিষ্ট সময় মদিনায় অবস্থান করেন। এরপর হিজরতের নবম বছরে তিনি আবু বকর (রা.)-কে মুসলমানদের হজের আমির নিযুক্ত করেন। সে সময় আরব সমাজ মূলত তিন শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল—মুসলিম, মুশরিক ও চুক্তিবদ্ধ গোত্রসমূহ। অনেক আরব তখনো জাহেলিয়াতের যুগের বিভিন্ন রীতি-নীতি আঁকড়ে ধরে হজে অংশ নিত।

 
এমনকি কেউ কেউ নগ্ন অবস্থায় কাবা তাওয়াফের মতো লজ্জাজনক প্রথাও অনুসরণ করত। এ পরিস্থিতিতে আবু বকর (রা.)-এর নেতৃত্বে হজ পরিচালনা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে ইসলামের অধীনে হজের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি সুদৃঢ় হয় এবং মুশরিক ও চুক্তিবদ্ধদের ব্যাপারে আল্লাহর চূড়ান্ত বিধান ঘোষণার পথ প্রস্তুত হয়। সিরাতের গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ আছে যে আবু বকর (রা.) একদল সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে কোরবানির পশুসহ হজের উদ্দেশে রওনা হন। মহানবী (সা.) নিজেও তাঁর সঙ্গে কোরবানির পশু পাঠিয়েছিলেন।

 

(সিরাতে ইবনে হিশাম, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা-৫৪৩)

চুক্তিসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত

মুশরিকদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা জারি করা হলেও ইসলাম সব ধরনের চুক্তিকে একসঙ্গে বাতিল করেনি; বরং পবিত্র কোরআন অত্যন্ত ন্যায়সংগতভাবে তাদের মধ্যে পার্থক্য করেছে—একদিকে তারা, যারা নিজেদের অঙ্গীকার ও চুক্তির প্রতি বিশ্বস্ত ছিল; অন্যদিকে তারা, যারা চুক্তি ভঙ্গ করেছিল বা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। যেসব মুশরিক নির্ধারিত মেয়াদের চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল এবং তারা চুক্তি ভঙ্গ করেনি কিংবা মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাউকে সহযোগিতা করেনি, ইসলাম তাদের চুক্তি পূর্ণ মেয়াদ পর্যন্ত বহাল রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তবে মুশরিকদের মধ্যে যাদের সঙ্গে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে, অতঃপর তারা কোনো ব্যাপারে তোমাদের প্রতি ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করেনি—তাদের সঙ্গে তাদের চুক্তি নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত পূর্ণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন।’

(সুরা : তাওবা, আয়াত : ৪)

অন্যদিকে যাদের সঙ্গে কোনো চুক্তি ছিল না অথবা যাদের চুক্তি ছিল অনির্দিষ্ট ও সময়সীমাবিহীন কিংবা যাদের চুক্তির মেয়াদ ছিল চার মাসের কম, তাদের চার মাস সময় দেওয়া হয়েছিল, যাতে তারা নিরাপদে নিজেদের বিষয় নিষ্পত্তি করতে পারে এবং স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব, তোমরা পৃথিবীতে চার মাস অবাধে চলাফেরা করো এবং জেনে রাখো, তোমরা আল্লাহকে অক্ষম করতে পারবে না; আর নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফিরদের লাঞ্ছিত করবেন।’

(সুরা : তাওবা, আয়াত : ২)

এভাবেই সেই ঐতিহাসিক হজে ইসলামের সৌন্দর্য ও ভারসাম্য নীতি ফুটে ওঠে। একদিকে ছিল কাবাঘরকে শিরক ও জাহেলিয়াতের অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করার দৃঢ় অবস্থান, অন্যদিকে ছিল চুক্তি রক্ষায় বিশ্বস্ত ও নিরপেক্ষ লোকদের প্রতি ন্যায়বিচার, বিশ্বস্ততা ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত। ইসলামের এই নীতিই প্রমাণ করে যে ইসলাম কখনো অবিচার বা বিশ্বাসঘাতকতাকে সমর্থন করে না; বরং ন্যায়, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং সত্যনিষ্ঠাকেই সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়।

বৃহত্তর হজের দিন

এই ঐতিহাসিক ঘোষণাটি প্রদান করা হয়েছিল কোরবানির দিনে, যাকে পবিত্র কোরআনে ‘ইয়াওমুল হাজ্জিল আকবার’ বা ‘বৃহত্তর হজের দিন’ বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর বৃহত্তর হজের দিনে মানুষের প্রতি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হলো যে আল্লাহ মুশরিকদের থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং তাঁর রাসুলও মুক্ত।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩)

তাফসিরকারদের মতে, ‘বৃহত্তর হজের দিন’ বলতে কোরবানির দিনকেই বোঝানো হয়েছে। কারণ এদিনেই হজের বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা একত্র হয়। যেমন—জামারাতে পাথর নিক্ষেপ, কোরবানি, মাথা মুণ্ডন ও কাবা তাওয়াফ। প্রসিদ্ধ সিরাতবিদ সাফিউর রহমান মুবারকপুরি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আর-রাহিকুল মাখতুম’-এ এই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, এটি ছিল আরব ভূমি থেকে মূর্তিপূজার চূড়ান্ত বিদায়ের ঘোষণা—যার পর আর কখনো সেই অন্ধকার যুগ ফিরে আসেনি।

আবু বকর (রা.)-এর ঐতিহাসিক ভূমিকা

হিজরতের নবম বছরে অনুষ্ঠিত আবু বকর (রা.)-এর হজ মূলত হিজরতের দশম বছরে মহানবী (সা.)-এর বিদায় হজের পটভূমি প্রস্তুত করে দেয়। এই হজের মাধ্যমে হজের মৌসুম থেকে জাহেলিয়াত যুগের প্রকাশ্য ও অপবিত্র প্রথাগুলো দূর করা হয়। ফলে যখন মহানবী (সা.) বিদায় হজ পালনের জন্য আগমন করেন, তখন তিনি একটি সুসংগঠিত, পবিত্র ও তাওহিদভিত্তিক হজের পরিবেশ দেখতে পান। মুসলিম উম্মাহ তখন তাঁর কাছ থেকে হজের বিধান, মানবাধিকারের মৌলিক শিক্ষা এবং ইসলামের সার্বিক দিকনির্দেশনা গ্রহণে পুরোপুরি সমর্থ হয়। এখানেই আবু বকর (রা.)-এর হজের প্রস্তুতিমূলক গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর হজ ছিল আহবান, পরিশুদ্ধি ও সাংগঠনিক সংস্কারের হজ; আর বিদায় হজ ছিল পূর্ণতা, ব্যাখ্যা ও চূড়ান্ত দিকনির্দেশনার হজ। প্রথম হজে ঘোষণা করা হয়েছিল যে কাবার আনুষ্ঠানিকতায় আর কোনো মুশরিকের অংশগ্রহণ থাকবে না। আর বিদায় হজে মহানবী (সা.) তাঁর উম্মতের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘তোমরা তোমাদের হজের আনুষ্ঠানিকতা আমার কাছ থেকে শিখে নাও।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১২৯৭)

এই নবম হিজরির হজে আবু বকর (রা.) নেতৃত্ব দেন, আর আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) মুশরিকদের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দেন। এভাবেই বিদায় হজের পটভূমি প্রস্তুত হয়। কাবাঘরকে শিরকের সব চিহ্ন থেকে পবিত্র করা হয়, হজের পরিবেশকে বিশুদ্ধ করা হয়। ফলে নবুয়তের চূড়ান্ত বার্তা এমন এক উর্বর পরিবেশে পৌঁছে যায়, যা ইসলামের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য পরিপূর্ণ উপযোগী ছিল।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ