১৮ অক্টোবর ২০২৬ , ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সাব-রেজিস্টারশূন্য লালমনিরহাট: ভাড়াটে কর্মকর্তায় চলছে ৫ অফিস

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ০২-০৬-২০২৬
সাব-রেজিস্টারশূন্য লালমনিরহাট: ভাড়াটে কর্মকর্তায় চলছে ৫ অফিস স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রারের অভাবে অন্য অফিসের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে চালানো হচ্ছে লালমনিরহাটের অদিতমারী সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়সহ পাঁচটি কার্যালয়।

জমি ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল সম্পাদন এবং এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পালন করেন সাব-রেজিস্টার। অথচ লালমনিরহাট জেলার পাঁচটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসই বর্তমানে স্থায়ী সাব-রেজিস্টারবিহীন। ফলে রাজস্ব আদায় ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সেবাপ্রার্থীরা।

সরকারের রাজস্ব আদায়ের অন্যতম উৎস জমি ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত বিভিন্ন কর। এসব কর আদায়ের জন্য দলিল নিবন্ধনের দায়িত্ব পালন করেন উপজেলা সাব-রেজিস্টাররা। কিন্তু জেলার পাঁচ উপজেলার পাঁচটি সাব-রেজিস্টার পদই বর্তমানে শূন্য। ফলে অন্য জেলার কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে অফিসগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে।

সপ্তাহে পাঁচ দিন কর্মদিবস থাকলেও কর্মকর্তা সংকটের কারণে অধিকাংশ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সপ্তাহে মাত্র এক বা দুই দিন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কোনো কোনো অফিসে গুরুত্বপূর্ণ এ পদটি দীর্ঘ আট থেকে নয় বছর ধরে শূন্য রয়েছে। পদায়নের বিষয়টি যেন কর্তৃপক্ষের নজরের বাইরে চলে গেছে।

সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে শূন্য রয়েছে পাটগ্রাম উপজেলা সাব-রেজিস্টার পদ। জেলা রেজিস্টারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা এ উপজেলায় ২০১৭ সালে সাব-রেজিস্টার রতন অধিকারী বদলি হওয়ার পর থেকে নতুন কোনো কর্মকর্তা পদায়ন করা হয়নি। প্রায় নয় বছর ধরে অফিসটি চলছে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে।

বর্তমানে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সাব-রেজিস্টার রাশেদুজ্জামান সপ্তাহে এক দিন পাটগ্রামে দায়িত্ব পালন করেন। একইসঙ্গে তিনি লালমনিরহাট সদর উপজেলা সাব-রেজিস্টারের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন। অর্থাৎ নিজের কর্মস্থল রাজারহাট ছাড়াও তিনি লালমনিরহাট সদর এবং প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরের পাটগ্রাম—এই তিনটি অফিসের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।

লালমনিরহাট সদর উপজেলা সাব-রেজিস্টার আহসান হাবিব ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল বদলি হওয়ার পর পদটি শূন্য হয়ে পড়ে। একই দিনে কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার সাব-রেজিস্টার রাশেদুজ্জামানও বদলি হন। এরপর থেকে এ দুই কার্যালয়ে কোনো স্থায়ী কর্মকর্তা নেই।

চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি বিসিএস ক্যাডারে নির্বাচিত হয়ে হাতীবান্ধা উপজেলা সাব-রেজিস্টার আরিফ ইশতিয়াক অন্যত্র যোগদান করেন। এরপর থেকে পদটি শূন্য রয়েছে। অন্যদিকে, একমাত্র আদিতমারী উপজেলায় সাব-রেজিস্টার শিউলী খাতুন পদায়ন থাকলেও বর্তমানে দুই মাসের প্রশিক্ষণে রয়েছেন তিনি।

এভাবে লালমনিরহাটের পাঁচটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসই কার্যত স্থায়ী কর্মকর্তাশূন্য অবস্থায় রয়েছে।

বর্তমানে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার সাব-রেজিস্টার কামরুন নাহার আদিতমারী উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সাব-রেজিস্টার সিরাজুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করছেন হাতীবান্ধা অফিসে। আর কালীগঞ্জের তুষভান্ডার অফিসে অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার সাব-রেজিস্টার রিপন চন্দ্র মণ্ডল।

অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিজ নিজ কর্মস্থলের পাশাপাশি এসব অফিসে সপ্তাহে মাত্র এক বা দুই দিন সময় দিতে পারছেন। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

ভুক্তভোগীরা জানান, সাব-রেজিস্টার না থাকায় অনেক সময় প্রয়োজনীয় কাজ না করেই ফিরে যেতে হয়। সপ্তাহে মাত্র এক দিন সাব-রেজিস্টার অফিসে এলে সেদিন আবার অনেক দাতা বা বিক্রেতা ছুটি পান না। ফলে দলিল নিবন্ধনের কাজ পিছিয়ে যায়। অনেক বিক্রেতা মেয়ের বিয়ে, চিকিৎসা কিংবা অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনেও সময়মতো জমি বিক্রি করতে পারছেন না।

তারা আরও বলেন, দীর্ঘ ভোগান্তির পর সাব-রেজিস্টার ও দলিলদাতা উভয়কে একসঙ্গে পাওয়া গেলেও নতুন সমস্যা দেখা দেয়। এক দিনে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে দলিল লেখক ও সাব-রেজিস্টারদের পক্ষে প্রতিটি দলিল যথাযথভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ভুলত্রুটি থেকে যাওয়ার এবং ভুলভাবে দলিল সম্পাদনের ঝুঁকি তৈরি হয়। সপ্তাহের পাঁচ দিনের কাজ এক দিনে সম্পন্ন করতে গিয়ে ভুল হওয়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সাব-রেজিস্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকলে দলিল নিবন্ধন, নকল সরবরাহ, পুরোনো দলিল সংগ্রহসহ বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এতে একদিকে সরকারের রাজস্ব আদায় কমে যায়, অন্যদিকে জনদুর্ভোগ বাড়তে থাকে।

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত শূন্য পদগুলোতে সাব-রেজিস্টার পদায়ন করে স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।

এ বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা রেজিস্টার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জেলার পাঁচটি কার্যালয়ে সাব-রেজিস্টার পদে বাইরের জেলার কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জনভোগান্তি কমাতে সাব-রেজিস্টার পদায়নের জন্য কয়েক দফায় মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সাব-রেজিস্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকলে অফিসের সার্বিক কার্যক্রম গতিহীন হয়ে পড়ে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত পদায়ন হলে এ জনদুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ