আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (13th General Election) অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কঠোর প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গত ২০ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সংক্রান্ত এক উচ্চপর্যায়ের প্রাক প্রস্তুতিমূলক সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে সবার সম্মিলিত সহযোগিতা অপরিহার্য বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর তিনি জোর দেন। এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে, সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে নির্বাচনে 'ম্যাজিস্ট্রেসি' (Magistracy) এবং 'বিচারিক ক্ষমতা' (Judicial Power) দেওয়ার জন্য জোরালো ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি নিরাপত্তা কার্যক্রমে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার (BDT 400 Crore) বিশাল বাজেট ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের দাবি জানানো হয়েছে।
সমন্বয়ের কৌশল ও নিরাপত্তার ‘রেড জোন’ পরিকল্পনা
প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাঁর বক্তব্যে আসন্ন নির্বাচনের 'গুরুত্ব' এবং 'তাৎপর্য' তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এত বড় 'কর্মযজ্ঞ' কমিশনের একার পক্ষে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়, তাই সবার সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন। সিইসি জানান, নির্বাচনে অনেক প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ থাকতে পারে, যা শুধুমাত্র আন্তরিকতা ও সমন্বয়ের (Coordination) মাধ্যমে দূর করা সম্ভব।
নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রসঙ্গে সিইসি 'স্টেট অ্যাসেসমেন্ট' (State Assessment) করে 'ডেপ্লয়মেন্ট প্ল্যান' (Deployment Plan) তৈরির নির্দেশ দেন। তিনি পরামর্শ দেন, এলাকাগুলোকে 'রেড', 'ইয়েলো' এবং 'গ্রিন জোনে' (Red, Yellow, and Green Zones) বিভক্ত করে নিরাপত্তা ছক কষা যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ 'পেশাদারিত্ব' (Professionalism) ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
সশস্ত্র বাহিনীর বিশাল প্রস্তুতি ও আর্থিক দাবি
সভায় সেনাবাহিনী প্রধানের প্রতিনিধি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি ও চাহিদার কথা তুলে ধরেন। জানানো হয়, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা, ভোটার এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তার জন্য বাহিনীগুলোর মধ্যে 'অন্তঃসমন্বয়' (Internal Coordination) প্রয়োজন। নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের ওপর হামলা, কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই, ভোটদানে বাধা এবং সংখ্যালঘু এলাকায় হামলার মতো গুরুতর ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে।
মূল দাবি ও প্রস্তুতির সারসংক্ষেপ:
মোতায়েন পরিকল্পনা: ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ (In Aid to Civil Power) এর আওতায় সারা দেশে ৬২টি জেলায় সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে মোতায়েন আছে। নির্বাচনের আগের তিন দিন, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচন-পরবর্তী চার দিন—মোট আট দিনের জন্য সেনা মোতায়েন রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সদস্য সংখ্যা ও বাজেট: সারা দেশে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ সেনা সদস্যকে নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত করার প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আনুমানিক ৪০০ কোটি টাকার বাজেট (Budget) প্রয়োজন হতে পারে।
ক্ষমতা বৃদ্ধি: সরকারকে ইতোমধ্যে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি 'বিচারিক ক্ষমতা' দেওয়া হলে সেনাবাহিনী আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে দাবি করা হয়।
প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম: নির্বাচনী কাজের জন্য সেনাবাহিনীকে 'ড্রোন' (Drone) ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া, জরুরি প্রয়োজনে 'আর্মি এভিয়েশন' (Army Aviation) প্রস্তুত রাখা এবং চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানানো হয়।
অন্যান্য বাহিনীর কৌশল ও ডিজিটাল নজরদারি
সভায় নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, আনসার ও ভিডিপি, পুলিশ, র্যাব, কোস্টগার্ড, এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তাদের কর্মপরিকল্পনা ও চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে।
নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী: নৌবাহিনী উপকূলীয় চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকায় পরিবহন সংকট মোকাবিলায় নিজস্ব জলযান ব্যবহারের পাশাপাশি সিভিল জলযান ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছে। বিমানবাহিনী সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় রেখে পরিবহন বিমান প্রস্তুত রাখার কথা জানিয়েছে।
আনসার ও ভিডিপি: মহাপরিচালক জানান, এবারের নির্বাচন ভিন্ন প্রেক্ষাপটের হওয়ায় ঝুঁকিগুলো ব্যতিক্রম। প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার নতুন অভিজ্ঞ আনসার-ভিডিপি সদস্য নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তাদের পোশাক ও অস্ত্রের জন্য দ্রুত অর্থ বরাদ্দের অনুরোধ জানানো হয়।
ডিজিটাল ও সাইবার চ্যালেঞ্জ: স্বরাষ্ট্র সচিব প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে 'বডিওর্ন ক্যামেরা' (Body-Worn Camera) এবং ভোটকেন্দ্রের আশপাশের দোকানগুলোকে রেকর্ডিংয়ের আওতায় আনার কথা বলেছেন। সিআইডি (CID) প্রধান এবং এনটিএমসি (NTMC) মহাপরিচালক 'সোশ্যাল মিডিয়া' (Social Media) ও 'এআই' (AI) ব্যবহার করে গুজব ছড়ানোর ঝুঁকি মোকাবিলায় অ্যাপস তৈরি এবং দ্রুত সঠিক তথ্য সরবরাহে গুরুত্ব দেন।
গোয়েন্দা তথ্য ও সমন্বয়: ডিজিএফআই (DGFI) এবং এনএসআই (NSI) এর পক্ষ থেকে মাঠ পর্যায় থেকে সংগৃহীত গোয়েন্দা তথ্য (Intelligence Data) সময়মতো সরবরাহের আশ্বাস দেওয়া হয়। পাশাপাশি, 'ক্রাইসিস মোমেন্টে' (Crisis Moment) কে কীভাবে সাড়া দেবে তা সুনির্দিষ্ট করার এবং সাংবাদিকদের জন্য 'মিডিয়া পলিসি' (Media Policy) প্রণয়নেরও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
নির্বাচন কমিশনারদের কঠোর নির্দেশনা
নির্বাচন কমিশনাররা নিরপেক্ষতা, শক্ত অবস্থান এবং দ্রুত সাড়া প্রদানের ওপর জোর দেন। কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, 'নির্বাচনী কাজে সফলতার জন্য সমন্বয়ের বিকল্প নেই।' আরেক কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ নিশ্চিত করেন যে, কমিশন গোপনে কোনো নির্দেশনা দেবে না, সব নির্দেশনা আইন ও বিধি মোতাবেক 'প্রকাশ্যে' দেওয়া হবে। তিনি স্যাবোটাজ (Sabotage) হতে পারে বলে সতর্ক করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার এবং 'কালো টাকার' ব্যবহার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলেন।
নির্বাচন কমিশনার বেগম তাহমিদা আহমদ বলেন, 'বিগত সময়ের খারাপ নির্বাচনের দায় বর্তমান দায়িত্বরতদের নিতে হচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে গর্বের জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।' কমিশনার আব্দুর রহমান মাসউদ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা ও 'প্রো অ্যাকটিভ' (Pro-Active) হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।