**বিষাক্ত ধোঁয়ায় ঢাকা দিল্লি: শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি **
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির বাতাস এক ভয়াবহ বিষাক্ত ধোঁয়ার কবলে। শ্বাসরুদ্ধকর এই দূষণ পরিস্থিতির প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ রোববার (৯ নভেম্বর) রাস্তায় নেমে আসেন। বিক্ষুব্ধরা সরকারের কাছে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। বার্তাসংস্থা এএফপি তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, প্রতিবাদকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল— “আমি নিঃশ্বাস নিতে চাই” (I want to breathe)। এই স্লোগানই দিল্লির তিন কোটি মানুষের দুর্ভোগের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত রাজধানীগুলোর তালিকায় দিল্লি নিয়মিতভাবে শীর্ষে থাকে। প্রতি বছর শীতকালে এই মহানগরী ঘন ধোঁয়াশা (Smog) দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে কল-কারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের ধুলা এবং কৃষিজমিতে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর ধোঁয়া মিশে দিল্লির বাতাসকে একরকম 'মৃত্যুফাঁদে' পরিণত করে।
প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ: জনগণের ক্ষোভ
রোববার রাজধানীর ঐতিহাসিক ইন্ডিয়া গেটের কাছে এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবাদকারীরা “আমরা বাঁচতে চাই,” “আমি শুধু নিঃশ্বাস নিতে চাই”— এমন সব প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে সরকারকে পরিবেশ রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চাপ দেন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক মা, নামরতা যাদব, তার ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি বলেন, “আমি আজ এখানে একজন মা হিসেবে এসেছি। আমি চাই না আমার সন্তান একদিন জলবায়ু উদ্বাস্তু (Climate Refugee) হয়ে যাক।”
সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বিক্ষোভের দিন ইন্ডিয়া গেটের কাছে বায়ুতে পিএম ২.৫-এর মাত্রা ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে প্রায় ১৩ গুণ বেশি। পিএম ২.৫ হলো অতি ক্ষুদ্র কণা যা সহজে রক্তে প্রবেশ করে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করতে পারে।
অন্য একজন বিক্ষোভকারী, তনভি কুসুম, আক্ষেপ করে বলেন, “প্রতি বছর একই চিত্র— দূষণ বাড়ে, মানুষ কষ্ট পায়, কিন্তু কোনো টেকসই সমাধান হয় না। এখন সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতেই হবে।” এক তরুণী সরাসরি বলেন, “দূষণ আমাদের জীবন কেড়ে নিচ্ছে।”
সরকারি উদ্যোগের ব্যর্থতা ও ভয়াবহ তথ্য
দূষণ কমাতে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ডিজেল ও পেট্রলচালিত গাড়ির আংশিক নিয়ন্ত্রণ (Partial Restriction) এবং রাস্তা ও বিভিন্ন স্থানে পানি ছিটিয়ে ধুলা কমানোর মতো উদ্যোগ রয়েছে। তবে, এই সমস্ত সরকারি উদ্যোগের কোনোটিতেই এখনো পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য বা দীর্ঘমেয়াদি ফল পাওয়া যায়নি।
বায়ুদূষণের ভয়াবহতা তুলে ধরে ২০১৯ সালে প্রকাশিত দ্য ল্যানসেট প্ল্যানেটারি হেলথ-এর এক গবেষণা বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ভারতে বায়ু দূষণের কারণে প্রায় ৩৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ সতর্ক করে জানিয়েছে যে, মারাত্মকভাবে দূষিত বাতাস শিশুদের শ্বাসতন্ত্রের তীব্র সংক্রমণের (Acute Respiratory Infections) ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য এক বড় হেলথ ক্রাইসিস।
দিল্লির এই পরিস্থিতি কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি চরম এমার্জেন্সি। জনগণের দাবি দ্রুত টেকনিক্যাল সলিউশন এবং পলিসি চেঞ্জ-এর মাধ্যমে এই সঙ্কট মোকাবিলার।