• জাতীয়
  • জুলাই সনদের জট: ঐকমত্যের সময়সীমা শেষ, সরকারের একক সিদ্ধান্তে উত্তপ্ত রাজনীতির মাঠ

জুলাই সনদের জট: ঐকমত্যের সময়সীমা শেষ, সরকারের একক সিদ্ধান্তে উত্তপ্ত রাজনীতির মাঠ

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
জুলাই সনদের জট: ঐকমত্যের সময়সীমা শেষ, সরকারের একক সিদ্ধান্তে উত্তপ্ত রাজনীতির মাঠ

গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের বিপরীতমুখী অবস্থানে ব্যর্থ হলো সমঝোতা প্রক্রিয়া। ১৩ নভেম্বর অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল-এর বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার, সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষায় অচলাবস্থা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির অশনি সংকেত।

ঐকমত্যের চরম ব্যর্থতা: বল এখন সরকারের কোর্টে

দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত 'জুলাই জাতীয় সনদ' বাস্তবায়ন এবং সংবিধানে প্রস্তাবিত সংস্কারের ওপর গণভোট (Referendum) আয়োজনের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার তীব্র মতভেদ এখন চরমে। এই বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর জন্য অন্তর্বর্তী সরকার যে সাত দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল, তা সোমবার শেষ হয়েছে। কিন্তু বড় রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে কোনো বৈঠক বা সমঝোতার উদ্যোগ নিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

ফলে, পুরো বিষয়টি এখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল-এর হাতে গিয়ে ঠেকেছে। সরকারি সূত্রগুলো জানাচ্ছে, আগামী বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ১৫ নভেম্বরের মধ্যে সরকার 'জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ' এবং গণভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশ (Ordinance) জারি করবে। সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে, দুটি নির্বাচন ভিন্ন ভিন্ন দিনে আয়োজন প্রায় অসম্ভব হওয়ায়, সরকার জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে।

মূল সঙ্ঘাত: গণভোটের সময় এবং উচ্চকক্ষের গঠন

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার বিরোধ মূলত দুটি বিষয়ে কেন্দ্রীভূত:

১. গণভোটের সময়সূচি:

  • সরকার ও বিএনপি: জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হোক। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আবারও এই অবস্থান নিশ্চিত করেছেন।
  • জামায়াত ও সমমনা দল (৮টি): জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ ৮ দলের জোট গণভোট নির্বাচনের আগেই, নভেম্বরের মধ্যেই আয়োজনের দাবিতে অনড়। তাদের মতে, ঐক্যমত কমিশনের সুপারিশ এভাবেই এসেছিল। এই দাবিতে তারা রাজপথে সক্রিয় এবং আগামীকাল (১১ নভেম্বর) পুরানা পল্টন মোড়ে গণসমাবেশের ডাক দিয়েছে। জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের হুমকি দিয়ে বলেন, "সোজা আঙুলে যদি ঘি না ওঠে তাহলে আঙুল বাঁকা করব।"

২. সংসদের উচ্চকক্ষ (Upper Chamber) গঠন পদ্ধতি:

  • সরকার (আংশিক) ও জামায়াত: সংসদের উচ্চকক্ষ সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation বা PR) পদ্ধতিতে গঠিত হোক। অর্থাৎ, জাতীয় নির্বাচনে দলগুলো যে ভোট পাবে, তার অনুপাতে উচ্চকক্ষে আসন পাবে। সরকারের ভেতরের বড় একটি অংশ এই পদ্ধতিকে সংসদের ভারসাম্য রক্ষার জন্য ইতিবাচক মনে করছে।
  • বিএনপি: নিম্নকক্ষে (Lower Chamber) যে দল যত আসন পাবে, সেই অনুপাতে উচ্চকক্ষে আসন বন্টন হোক।

সরকারের আশা, বিএনপি যদি পিআর পদ্ধতি মেনে নেয়, তাহলে জামায়াত ও অন্যরা একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট মেনে নেবে।

একই দিনে নির্বাচনের পক্ষে সরকারের যুক্তি

সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো ভিন্ন ভিন্ন দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে একাধিক টেকনিক্যাল ও অর্থনৈতিক সমস্যার কথা জানিয়েছে:

অর্থনৈতিক চাপ: ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভোট আয়োজনে অতিরিক্ত প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ হতে পারে।

ভোটার টানার ঝুঁকি: গণভোটে কোনো দলীয় প্রার্থীর সরাসরি সম্পৃক্ততা না থাকায় ভোটারদের কেন্দ্রে আনা কঠিন হতে পারে।

প্রশাসনিক সক্ষমতা: কয়েক মাসের ব্যবধানে দুটি বড় নির্বাচন পরিচালনার জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন আছে।

রাজনীতিকরণের ঝুঁকি: নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠিত হলে বিএনপি বা আওয়ামী লীগের মতো দলের কর্মীরা নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়ে সংস্কার বাস্তবায়নই ভেস্তে দিতে পারে।

রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে জাতীয় জীবনে সঙ্কট

জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে যখন রাজনৈতিক ডেডলক চলছে, ঠিক তখনই দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতেও ক্রাইসিস দেখা দিয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষায় অচলাবস্থা: ১০ম গ্রেডে বেতনসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত সহকারী শিক্ষকদের ওপর 'পুলিশি হামলার' প্রতিবাদে দেশজুড়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু হয়েছে। এর ফলে ৬৫ হাজার ৫৬৭টি বিদ্যালয়ের প্রায় ১ কোটি শিশু শিক্ষার্থীর ক্লাস বন্ধ হয়ে গেছে। বার্ষিক পরীক্ষার মাত্র তিন সপ্তাহ আগে এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাকশন-এর ফলে অভিভাবকরা চরম শঙ্কায় পড়েছেন। শিক্ষকরা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেছেন।

অর্থনীতিতে রাজনৈতিক ঝুঁকি: কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে আগামী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে দুটি ঝুঁকি শনাক্ত করা হয়েছে—আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট এবং এর প্রভাব হিসাবে বাড়তে পারে এমন ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা (Geopolitical Tension)। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করেছে যে এই পরিস্থিতি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও পরবর্তী পদক্ষেপ

রাজনৈতিক অচলাবস্থা সত্ত্বেও জাতীয় নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে প্রশাসন। সম্প্রতি ২৯ জেলায় জেলা প্রশাসক (DC) পদে রদবদল করা হয়েছে। এর পাশাপাশি পুলিশ সদরদপ্তরও নির্বাচন সামনে রেখে 'যোগ্য' এসপি খুঁজে বের করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং তাদের নিয়ে পৃথক 'পুল' গঠনের কাজ চলছে।

এখন সমস্ত নজর ১৩ নভেম্বরের অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল-এর বৈঠকের দিকে। দেশের রাজনীতি এখন অপেক্ষায়, সরকার শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়—যে সিদ্ধান্ত আগামী জাতীয় নির্বাচন এবং সংবিধান সংস্কারের রূপরেখা নির্ধারণ করে দেবে।