ফিলিস্তিনের গাজায় বহুল প্রতীক্ষিত যুদ্ধবিরতি বিশ্বজুড়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনলেও মাঠের বাস্তবতা রয়ে গেছে আগের মতোই ভয়াবহ। অস্ত্রবিরতির সুযোগে যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকার লাখ লাখ মানুষ খাদ্যাভাব ও চিকিৎসাসংকট থেকে মুক্তি পাবে—এমন আশা করা হলেও ইসরায়েলের অব্যাহত বাধার কারণে তা প্রহসনে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে নানা অজুহাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে ইসরায়েলি বাহিনী, যার ফলে ক্ষুধার্ত, আহত ও গৃহহীন মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ কমার বদলে নতুন রূপে আরও গভীর হচ্ছে।
প্রতিশ্রুতির আড়ালে লুকানো বাস্তবতা
জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের মতো সংস্থাগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ইসরায়েল ত্রাণবাহী ট্রাকগুলোর প্রবেশপথে ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করছে। প্রশাসনিক জটিলতা, অতিরিক্ত নিরাপত্তা তল্লাশির নামে হয়রানি এবং সীমান্ত Checkpost-এ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিলম্ব ঘটানো হচ্ছে। এর ফলে বহু ক্ষেত্রেই জীবনরক্ষাকারী খাদ্য ও ওষুধ গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে ইসরায়েল চরম খাদ্য সংকটে থাকা গাজায় প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক অত্যাবশ্যকীয় পণ্য প্রবেশের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু গত ১০ অক্টোবর ceasefire কার্যকর হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত দৈনিক গড়ে মাত্র ১০০টির মতো ট্রাক প্রবেশ করতে পেরেছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য।
গাজা এখন বিশ্বের সর্ববৃহৎ humanitarian crisis-এর সম্মুখীন। সেখানে নিরাপদ খাবার নেই, বিশুদ্ধ পানীয় জলের তীব্র সংকট, হাসপাতালগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ায় চিকিৎসাব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। যুদ্ধবিরতির পরও যদি মানবিক সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব না হয়, তবে এটি কেবল একটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটি এক ভয়াবহ নৈতিক বিপর্যয়।
নিয়ন্ত্রণ নিতে মাঠে নামছে যুক্তরাষ্ট্র
পরিস্থিতির ভয়াবহতায় এবার ত্রাণ সহায়তা প্রবেশ ও বিতরণ কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ সরাসরি ইসরায়েলি বাহিনীর হাত থেকে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সিভিল-মিলিটারি কোঅর্ডিনেশন সেন্টারের (CMCC) হাতে স্থানান্তরিত হতে যাচ্ছে। সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। যদিও ত্রাণ কার্যক্রমের নতুন এই ব্যবস্থাপনায় ইসরায়েলও একটি অংশ হিসেবে থাকবে, তবে কী ধরনের ত্রাণসামগ্রী গাজায় প্রবেশ করবে এবং কীভাবে তা বিতরণ করা হবে, সে সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে CMCC-এর হাতে। এই পদক্ষেপকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার একটি মরিয়া চেষ্টা হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও থামছে না রক্তপাত
চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে গাজায় ইসরায়েলের বিক্ষিপ্ত হামলা এখনো অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিনই হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। সর্বশেষ হামলায় একজন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও ৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে (১০ অক্টোবর) এ পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েলি হামলায় মোট ২৪১ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৬১৪ জন আহত হয়েছেন।
এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন না, বরং এটিকে এক ভয়াবহ নৈতিক বিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মুসলিম দেশগুলোকে এখন শুধু বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও জোরালো ও কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার জন্য চাপ বাড়ছে। গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে কেবল ইট-পাথর নয়, চাপা পড়েছে বিশ্ব মানবতার ন্যূনতম মূল্যবোধও। এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তার দায় পুরো বিশ্বের ওপর বর্তায় এবং এই লজ্জা থেকে মুক্তি পেতে বিশ্বজুড়ে মানবতার পক্ষে নির্ভীক কণ্ঠ তোলার আহ্বান ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।