প্রতিদিনের রান্নাঘরে পেঁয়াজ একটি অপরিহার্য উপাদান। কেবল সুস্বাদু পদ রান্নাতেই নয়, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং চুলের যত্নেও পেঁয়াজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই সহজলভ্য সবজিটি এবার বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস (Diabetes) রোগীদের জন্য এক নতুন আশার আলো নিয়ে এল। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে—পেঁয়াজের নির্যাস রক্তে শর্করার মাত্রা (Blood Sugar Level) প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সাহায্য করতে পারে।
রক্তে শর্করার মাত্রা কমানোর যুগান্তকারী তথ্য
ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে, বিশেষত যারা টাইপ ২ ডায়াবেটিসে (Type 2 Diabetes) আক্রান্ত, তাদের অগ্ন্যাশয় (Pancreas) থেকে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত ইনসুলিন (Insulin) তৈরি হতে পারে না। ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে থাকে। নাইজেরিয়ার আবরাকাতে অবস্থিত ডেল্টা স্টেট ইউনিভার্সিটির (Delta State University) একদল গবেষকের করা নতুন সমীক্ষায় জানা গেছে, পেঁয়াজের নির্যাস উচ্চ রক্তে শর্করাকে কার্যকরভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম। এটি এমন একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার, যা কোটি কোটি ডায়াবেটিস রোগীকে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার সুযোগ দিতে পারে।
শুধু শর্করা নয়, কমে কোলেস্টেরলও
এই গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক অ্যান্টনি ওজিহ (Anthony Ojieh) জানিয়েছেন, “পেঁয়াজ সস্তা এবং সহজলভ্য। এটি পুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পূরক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ডায়াবেটিস রোগীদের চিকিৎসায় পেঁয়াজের ব্যবহার বিশেষভাবে কার্যকরী হতে পারে।” গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, পেঁয়াজের নির্যাস শুধু ব্লাড সুগারই নয়, উচ্চ কোলেস্টেরলের (High Cholesterol) মাত্রাও দৃঢ়ভাবে হ্রাস করতে পারে। টোটাল কোলেস্টেরল (Total Cholesterol) কমানোর ক্ষেত্রে এর প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। এটি ডায়াবেটিসের সঙ্গে সম্পর্কিত হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতেও পরোক্ষভাবে সাহায্য করতে পারে।
গবেষণার পদ্ধতি ও ফলাফল
গবেষকরা তাদের তত্ত্বটি পরীক্ষার জন্য ইঁদুরের ওপর (in vivo study) গবেষণা চালান। মোট তিনটি গ্রুপের ডায়াবেটিক ও নন-ডায়াবেটিক ইঁদুরদের উপর পেঁয়াজের নির্যাসের বিভিন্ন ডোজ (Dose) প্রয়োগ করা হয়। শরীরের ওজন প্রতি কিলোগ্রামে যথাক্রমে ২০০ মিলিগ্রাম, ৪০০ মিলিগ্রাম ও ৬০০ মিলিগ্রাম হিসাবে ডোজগুলো নির্ধারণ করা হয়েছিল।
গবেষণায় দেখা যায়, যে সমস্ত ডায়াবেটিক ইঁদুরদের শরীরের ওজনের প্রতি কিলোগ্রামে ৪০০ মিলিগ্রাম এবং ৬০০ মিলিগ্রাম পেঁয়াজের নির্যাস দেওয়া হয়েছিল, তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা একটি বেসলাইন স্তরের (Baseline Level) তুলনায় যথাক্রমে ৫০ শতাংশ ও ৩৫ শতাংশ কমেছে। এর পাশাপাশি, ৪০০ মিলিগ্রাম এবং ৬০০ মিলিগ্রামের ডোজগুলি ডায়াবেটিক ইঁদুরদের টোটাল কোলেস্টেরলের মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম হয়েছে। যদিও গবেষণায় দেখা যায়, পেঁয়াজের নির্যাস নন-ডায়াবেটিক ইঁদুরদের মধ্যে ওজন বাড়িয়েছে, তবে ডায়াবেটিক ইঁদুরদের মধ্যে ওজন বৃদ্ধির মতো কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
পরবর্তী পদক্ষেপ ও সতর্কতা
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই গবেষণার ফলাফল অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক হলেও এটি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এটি মূলত ইঁদুরের উপর করা একটি গবেষণা। ডায়াবেটিস চিকিৎসায় এটিকে কার্যকর ওষুধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আগে অবশ্যই মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের (Clinical Trial) মাধ্যমে এর সুরক্ষা ও কার্যকারিতা প্রমাণ করা প্রয়োজন। তবে, এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ঘরোয়া প্রতিকার এবং সাধারণ খাদ্যের উপাদানগুলোর ভূমিকা আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখার অবকাশ রয়েছে।