২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের হওয়া ঐতিহাসিক মামলার রায় ঘোষণার দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণার দিনক্ষণ আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) নির্ধারণ করতে পারেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই তারিখ ঘোষণা করবেন বলে আশাবাদী রাষ্ট্রপক্ষ।
এই মামলার অভিযুক্তের তালিকায় শেখ হাসিনার সঙ্গে আরও রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। তবে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় তাদের পলাতক হিসেবে গণ্য করেই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
যেভাবে এগিয়েছে বিচার প্রক্রিয়া দেশের বিচারিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে এই মামলার অধিকাংশ শুনানি টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। গত ১০ জুলাই শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়।
বিচারিক প্রক্রিয়ার এক নাটকীয় মোড় আসে যখন মামলার অন্যতম আসামি, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী (Approver) হওয়ার আবেদন করেন। ট্রাইব্যুনাল তার আবেদন মঞ্জুর করলে তিনি এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে সাক্ষ্য প্রদান করেন, যা মামলার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে সর্বমোট ৫৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। এদের মধ্যে ছিলেন গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতীক শহীদ আবু সাঈদের বাবাসহ স্বজনহারা একাধিক পরিবারের সদস্যরা। এছাড়া স্টার উইটনেস (Star Witness) হিসেবে সাক্ষ্য দেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এবং দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান।
চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক ও রায়ের অপেক্ষা টানা পাঁচ দিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর গত ১৬ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষের অর্থাৎ প্রসিকিউশনের শুনানি শেষ হয়। এরপর ২২ অক্টোবর পলাতক আসামি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী (State Defence) এবং উপস্থিত রাজসাক্ষী চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন সম্পন্ন হয়।
২৩ অক্টোবর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান তার সমাপনী বক্তব্যে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রার্থনা করেন। চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামও একই দাবি জানান। অন্যদিকে, রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন পলাতক দুই আসামির খালাস প্রার্থনা করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার তারিখ পরবর্তীতে জানানো হবে বলে আদেশ দেন, যার জন্য ১৩ নভেম্বর দিনটি ধার্য করা হয়।
প্রসিকিউশনের মূল পাঁচ অভিযোগ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার জমা দেওয়া ৮,৭৪৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে প্রসিকিউশন মোট পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করে:
১. উসকানি ও গণহত্যা: ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। অভিযোগ করা হয়, এর জেরেই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির প্ররোচনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সশস্ত্র দলীয় সন্ত্রাসীরা নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ চালায়, যাতে প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত ও ২৫ হাজার আহত হন।
২. সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি: অভিযোগ অনুযায়ী, শেখ হাসিনা হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ও ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়রের সঙ্গে তার কথোপকথনের অডিও রেকর্ডের ভিত্তিতে এই অভিযোগ আনা হয়। সর্বোচ্চ পদে থেকে নির্দেশ দেওয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির (Superior Responsibility) আওতায় অভিযোগ গঠন করা হয়।
৩. আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড: রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় তিন আসামিকেই অভিযুক্ত করা হয়।
৪. চানখাঁরপুল হত্যাকাণ্ড: রাজধানীর চানখাঁরপুলে আন্দোলনরত অবস্থায় ছয়জন নিরীহ ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায়ও তাদের অভিযুক্ত করা হয়।
৫. আশুলিয়া হত্যাকাণ্ড: আশুলিয়ায় ছয়জন নিরীহ ব্যক্তিকে গুলি করে ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায়ও শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
বুধবার প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, "রায়ের তারিখ নির্ধারণ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার। তবে আমরা বিশ্বাস করি, আগামীকাল আমরা একটি তারিখ পাব।" রায়ের তারিখ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সহিংসতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার কোনো চেষ্টাকে আমরা ‘থ্রেট টু জাস্টিস’ (threat to justice) বলে মনে করছি না।"