• আন্তর্জাতিক
  • তাজিকিস্তানের আইনি বিমানঘাঁটি থেকে ভারতের নীরবে সরে আসার রহস্য: রাশিয়া-চীনের চাপেই কি হাতছাড়া হলো একমাত্র সামরিক ঘাঁটি?

তাজিকিস্তানের আইনি বিমানঘাঁটি থেকে ভারতের নীরবে সরে আসার রহস্য: রাশিয়া-চীনের চাপেই কি হাতছাড়া হলো একমাত্র সামরিক ঘাঁটি?

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
তাজিকিস্তানের আইনি বিমানঘাঁটি থেকে ভারতের নীরবে সরে আসার রহস্য: রাশিয়া-চীনের চাপেই কি হাতছাড়া হলো একমাত্র সামরিক ঘাঁটি?

দুই দশক ধরে ৮ কোটি ডলার ব্যয়ে পরিচালিত ঘাঁটিটি কৌশলগতভাবে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা মধ্য এশিয়ায় ভারতের সামরিক উপস্থিতি ও চীনের প্রভাববলয়ে 'স্ট্র্যাটেজিক ইমপ্যাক্ট' নিশ্চিত করত।

তাজিকিস্তানে অবস্থিত আইনি বিমানঘাঁটি (Ayni Air Base) থেকে ভারত তিন বছর ধরে নীরবে নিজেদের সকল সেনাসদস্য (Military Personnel) ও সামরিক সরঞ্জাম (Military Equipment) প্রত্যাহার করে নিয়েছে। গত মাসেই এই চাঞ্চল্যকর খবরটি সামনে আসে, যা দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিদেশের মাটিতে ভারতের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচালিত হচ্ছিল। মধ্য এশিয়ার কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল একটি অঞ্চলে এমন নীরব সামরিক প্রত্যাহার দেশের প্রতিরক্ষা মহলে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

দুই দশকের সম্পর্ক ও কৌশলগত গুরুত্ব (Strategic Importance)

ভারত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই বিমানঘাঁটি তৈরি ও পরিচালনা করত। এটি কেবল বিদেশের মাটিতে ভারতের একমাত্র সামরিক ঘাঁটি ছিল না, বরং এটি মধ্য এশিয়ায় নয়াদিল্লির একটি শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করত। বিশেষত, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী পাকিস্তানের উপর কৌশলগত প্রভাব (Strategic Impact) বিস্তারের ক্ষেত্রে এই ঘাঁটির ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। রাশিয়া (Russia) এবং চীনের (China) মতো শক্তিধর দেশের প্রভাববলয়ে নিজেদের একটি অবস্থান ধরে রাখার সুযোগ দিত এই ঘাঁটি।

আইনি বিমানঘাঁটি এমন একটি কৌশলগত অবস্থানে ছিল, যা ভারতকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা এনে দিয়েছিল।

আফগানিস্তান সংযোগ: আফগানিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে নর্দার্ন অ্যালায়েন্সকে সহায়তা দিতে ভারত প্রথম এখানে সেনা মোতায়েন করেছিল। এমনকি ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান কাবুল দখল করার পর এই ঘাঁটি ব্যবহার করেই ভারত তাদের নাগরিকদের সরিয়ে এনেছিল।

ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান: ঘাঁটিটি আফগানিস্তানের ওয়াখান করিডর (Wakhan Corridor) থেকে মাত্র প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই করিডর পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর এবং চীনের শিনজিয়াং প্রদেশের (Xinjiang Province) সঙ্গে সীমানা ভাগ করে নিয়েছে। এই সরু, স্থলবেষ্টিত এলাকাটি চীন ও পাকিস্তানের জন্য নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য বাণিজ্যিক কারণেও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব (Geopolitical Significance) বহন করে।

৮ কোটি ডলার ব্যয়: আইনি ঘাঁটির আধুনিকায়ন (Modernization)

সাবেক সোভিয়েত আমলে আইনি বিমানঘাঁটিটি তৈরি হলেও সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর তা করুণ দশায় পড়ে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভারত এর সংস্কার ও আধুনিকায়নের (Modernization) জন্য প্রায় ৮ কোটি ডলার (80 Million USD) ব্যয় করে।

এই সংস্কারকাজের মধ্যে ছিল— ৩ হাজার ২০০ মিটার দীর্ঘ রানওয়ে মেরামত ও উন্নয়ন, যা এটিকে সুখোই-৩০ এমকেআই (Sukhoi-30 MKI) যুদ্ধবিমান এবং ভারী মালবাহী উড়োজাহাজ (Heavy-lift Aircraft) ওঠানামার উপযোগী করে তোলে। এছাড়াও, উড়োজাহাজ রাখার হ্যাঙ্গার, জ্বালানি ডিপো (Fuel Depot) এবং অত্যাধুনিক এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (Air Traffic Control - ATC) ব্যবস্থা নির্মাণ করা হয়েছিল। এই সংস্কারের কাজ মূলত ২০০২ সালের তাজিক সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির (Bilateral Agreement) আওতায় হয়েছিল।

একসময় ভারত সেখানে প্রায় ২০০ সেনা ও বিমানবাহিনীর সদস্য মোতায়েন করেছিল এবং কয়েকটি সুখোই–৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমানও সেখানে রাখা হয়েছিল।

চুক্তির অবসান: নীরব প্রত্যাহারের আসল কারণ

ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, তাজিকিস্তানের সঙ্গে এই ঘাঁটির সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য করা দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মেয়াদ ২০২২ সালে শেষ হয়ে যায়। এরপর অবকাঠামো তাজিকিস্তান সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তবে সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নীরব প্রত্যাহারের আসল কারণটি আরও গভীর। ভারত বুঝতে পারছিল যে, রাশিয়া ও চীনের প্রবল ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitical) চাপের কারণে তাজিকিস্তান সরকার এই ঘাঁটিকে ঘিরে ভারতের সঙ্গে চুক্তি নবায়নে অনিচ্ছুক ছিল। এই অঞ্চলের প্রধান শক্তিধর দেশগুলোর প্রভাবে তাজিকিস্তানের অবস্থান পরিবর্তন হওয়ায় ভারত সেখান থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহার করে নেওয়ার কৌশল নেয়।

ভারতের উপর প্রভাব: এক বড়সড় কৌশলগত ধাক্কা

আইনি বিমানঘাঁটি থেকে ভারতের সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহার নিঃসন্দেহে দেশটির জন্য এক বড়সড় কৌশলগত ধাক্কা।

১. একমাত্র বিদেশি ঘাঁটির ক্ষতি: এটি ছিল বিদেশের মাটিতে ভারতের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ সামরিক ঘাঁটি, যা ভারতকে মধ্য এশিয়ায় সরাসরি সামরিক প্রবেশাধিকার (Access) দিত। এই ঘাঁটি হারানোর ফলে ওই অঞ্চলে ভারতের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা (Strategic Capability) হ্রাস পেল।

২. গোয়েন্দা কার্যক্রমের শূন্যতা: বিদেশের মাটিতে সামরিক ঘাঁটি একটি দেশের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের (Intelligence Operations) জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শূন্যস্থান পূরণ করে। আইনি ঘাঁটি হারানোয় ভারত শিনজিয়াং, ওয়াখান করিডর এবং আফগানিস্তান সংলগ্ন এলাকায় নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হারালো।

৩. চীন-পাকিস্তান সংলগ্ন এলাকা: ঘাঁটিটি ওয়াখান করিডরের কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় এটি চীন ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত সংবেদনশীল সীমান্ত অঞ্চলের উপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিত। এই সুবিধা থেকে ভারত এখন বঞ্চিত হলো, যা ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমানে কয়েকটি দেশের সঙ্গে সামরিক সহায়তা চুক্তি (Military Cooperation) থাকলেও বিদেশের মাটিতে ভারতের আর কোনো পূর্ণাঙ্গ সামরিক ঘাঁটি নেই।