• আন্তর্জাতিক
  • জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক বিজয়ের নেপথ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কৌশলবিদ জারা রহিম

জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক বিজয়ের নেপথ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কৌশলবিদ জারা রহিম

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক বিজয়ের নেপথ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কৌশলবিদ জারা রহিম

ওবামা ও হিলারি ক্লিনটনের প্রচার দলে কাজ করার অভিজ্ঞতা; ‘রাজনৈতিক কল্পনার বদলে প্রকৃত নিউইয়র্ককে নিয়ে প্রচার চালাও’—জারার এই কৌশলই বদলে দেয় নির্বাচনের মোড়।

নিউইয়র্ক নগরের (New York City) রাজনীতিতে সম্প্রতি এক নতুন ইতিহাস তৈরি করেছেন দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী সন্তান, তরুণ নেতা জোহরান মামদানি (Joharan Mamdani)। তিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে (Primary) নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমোকে পরাজিত করে, পরে ৪ নভেম্বরের মেয়র নির্বাচনে (Mayoral Election) জয়ী হন। এই ঐতিহাসিক সাফল্যের নেপথ্যে ছিলেন এক কৌশলী চিন্তাশীল মানুষ—বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন তরুণী জারা রহিম (Zara Rahim)।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে ডিজিটাল কৌশলকে (Digital Strategy) দারুণভাবে ব্যবহার করে চলেছেন জারা। তাঁর এই কৌশলগত দক্ষতা জোহরানের নির্বাচনী প্রচারকে (Election Campaign) অভূতপূর্ব সফলতা এনে দিয়েছে।

জারা রহিমের যুগান্তকারী পরামর্শ

গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে জারা রহিম জোহরানের প্রধান উপদেষ্টা (Chief Advisor) হিসেবে কাজ শুরু করেন। নিউইয়র্ক টাইমসের (New York Times) এক সাক্ষাৎকারে নবনির্বাচিত মেয়রের উপদেষ্টা জানান, জারা রহিম জোহরানকে যে পরামর্শ দেন, তা পুরো নির্বাচনী প্রচারের ভিত্তি তৈরি করে দেয়। পরামর্শটি ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ: “রাজনৈতিক কৌশলবিদদের বানানো কল্পিত নিউইয়র্ককে ভুলে যাও, প্রকৃত নিউইয়র্ক নগর নিয়ে প্রচার চালাও।”

জারার এই ধারণাই তৈরি করে দেয় এক তৃণমূল আন্দোলন (Grassroots Movement), যেখানে ৯০ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক (Volunteers) কাজ করেছেন। এই বিশাল স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী সেইসব ভোটারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে, যাঁদের নিউইয়র্ক নগরের প্রথাগত রাজনীতি এত দিন উপেক্ষা করে এসেছিল।

ওবামা ও ‘ভোগ’ থেকে হোয়াইট হাউস যাত্রা

৩৫ বছর বয়সী এই যোগাযোগ কৌশলবিদের (Communication Strategist) জীবনের গল্প কর্মদক্ষতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ফ্লোরিডার সাউথ ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি অভিবাসী মা-বাবার সন্তান জারা রাজনীতিতে প্রথম পা রাখেন ২০১২ সালে বারাক ওবামার (Barack Obama) দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী প্রচারে শিক্ষানবিশ (Intern) হিসেবে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে।

ওবামা প্রশাসন: তিনি ফ্লোরিডা ডিজিটাল কনটেন্ট ডিরেক্টর (Digital Content Director) হিসেবে পদোন্নতি পান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (Social Media) ব্যবহার করে ভোটারদের সচেতন ও সংগঠিত করার কৌশল রপ্ত করেন। এরপর তিনি ওবামা প্রশাসনের হোয়াইট হাউস অফিস অব ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিতে (White House Office of Digital Strategy) কাজ করেন।

করপোরেট ও ফ্যাশন জগতে: হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর তিনি উবারে (Uber) যোগ দেন। পরে ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনের (Hillary Clinton) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে কাজ করেন। এরপর তিনি ভোগ (Vogue) সাময়িকীর যোগাযোগ পরিচালক (Director of Communications) হিসেবে (২০১৭–১৮) কাজ করে জনসংযোগ ও ভাবমূর্তি তৈরির কৌশলকে আরও শাণিত করেন।

প্রভাবশালী ক্লায়েন্ট: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জারা যোগাযোগ পরামর্শক হিসেবে এ২৪, মারায়া কেরি (Mariah Carey) এবং নেটফ্লিক্সের (Netflix) মতো হাই-প্রোফাইল মক্কেলদের (Clients) সঙ্গে কাজ করেছেন।

জোহরানের বিজয়ের কৌশল: সরাসরি সংযোগ

জারার নির্বাচনী প্রচারকৌশলের মূল ভিত্তি ছিল নির্ভেজাল (Authentic) ও সরাসরি সংযোগ (Direct Connection) তৈরি করা। বিশেষ করে সেইসব শ্রমজীবী ও অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে, যাদের প্রথাগতভাবে উপেক্ষা করা হয়।

তিনি জোহরানের জন্য একটি ‘কঠোর সময়সূচি’ তৈরি করেন। টিকটক (TikTok) ও ইনস্টাগ্রামের (Instagram) ভিডিও শুটের ফাঁকে জোহরান মামদানি নানা ভাষায় (স্প্যানিশ ও হিন্দি) শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন। বাংলাদেশি চাচারা ও পশ্চিম আফ্রিকার চাচিরা দেখলেন, কেউ তাঁদের মসজিদে আসছেন, তাঁদের পাড়াকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই কৌশল নিউইয়র্কের প্রায় ১০ লাখ মুসলিমের (Muslim Community) কাছেও দারুণ বার্তা পৌঁছায়।

জারা এবং তাঁর দল ঐতিহ্যবাহী সাংগঠনিক পদ্ধতি এবং আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতির জনপ্রিয়তাকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেন। এই প্রচার দল জানায়, তারা ‘শুধু ভোট চাওয়ার সংস্কৃতি নয়’ প্রকৃত অর্থে তারা ‘যোগাযোগের সংস্কৃতি’ (Culture of Communication) গড়ে তুলেছে। ফলস্বরূপ, প্রাইমারিতেই তাঁদের স্বেচ্ছাসেবকরা ১৬ লাখ পরিবারের দরজায় গেছেন এবং ২ লাখ ৪৭ হাজার ভোটারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। চূড়ান্ত লড়াইয়ের সময় স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা ৯০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।

ক্ষমতা গ্রহণের ট্রানজিশন টিম (Transition Team)

৪ নভেম্বর মেয়র হিসেবে জোহরানের বিজয়ের পর তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। তাঁর ক্ষমতা গ্রহণের ট্রানজিশন টিমটি সম্পূর্ণরূপে নারীদের নিয়ে গঠিত, যার মধ্যে জারা রহিম অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। এই দলে আরও রয়েছেন সাবেক ফেডারেল ট্রেড কমিশন (Federal Trade Commission - FTC) প্রধান লিনা খান, সাবেক উপ-মেয়র মারিয়া তোরেস-স্প্রিংগারসহ অন্যান্য অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা। এই দল ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জোহরানের দায়িত্ব গ্রহণের আগে থেকে তাঁকে সহায়তা করবে।

জারা রহিমের এই যাত্রা প্রমাণ করে, আধুনিক ডিজিটাল রাজনীতিতে কেবল বার্তা ছড়ানোই যথেষ্ট নয়; বরং মানুষের মন, অভিজ্ঞতা এবং সংস্কৃতির সঙ্গে কৌশলগতভাবে যুক্ত হওয়া কতটা জরুরি।