সম্প্রতি ব্যাংককগামী একটি ফ্লাইটে ২০ থেকে ২২ বছর বয়সী এক তরুণের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতা দেশের পোশাক খাতের (Garment Sector) এক গভীর বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় সাধারণ শ্রমিক হিসেবে মাসিক ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা বেতন পেতেন ওই তরুণ। অথচ বর্তমানে তিনি কম্বোডিয়ায় (Cambodia) চাকরি করতে যাচ্ছেন, যেখানে তাঁর মাসিক বেতন হবে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। এই অভাবনীয় পার্থক্য কেন? যেখানে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাত বিশ্ববাজারে এখনো প্রতিযোগিতায় টিকে আছে, সেখানে কম্বোডিয়া কীভাবে একই শ্রমিককে তিন গুণ বেশি বেতন দিয়েও আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখছে?
১৮ হাজার থেকে ৬০ হাজার: এক তরুণের কম্বোডিয়া যাত্রা
ওই তরুণ জানান, তাঁর মামা কম্বোডিয়ার একটি গার্মেন্টস কারখানায় সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করেন এবং তাঁর মাসিক আয় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। মামার হাত ধরেই এই নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন তিনি। শ্রমিকের বেতন কেবল একটি আর্থিক সূচক নয়, বরং এটি পুরো শিল্প কাঠামোর গভীর বাস্তবতার প্রতিফলন—এই ঘটনা সেই প্রশ্নটিই তুলে ধরে।
কম্বোডিয়ার এই দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুতর প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি (Fair Wage) নিশ্চিত করার পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কীভাবে টিকে থাকা যায়?
কম্বোডিয়া কীভাবে বেশি বেতন দিয়েও প্রতিযোগিতায় টিকে?
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু এবং বিডিজবস-এর কর্ণধার ফাহিম মাশরুরের সঙ্গে আলাপচারিতায় এই কাঠামোগত কারণগুলো উঠে আসে। তাঁর বিশ্লেষণ ছিল অত্যন্ত বাস্তবসম্মত:
১. দক্ষ সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain Efficiency): কম্বোডিয়া চীনের প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় তাদের কাঁচামাল (Raw Materials), মেশিনারি (Machinery) ও সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) অনেক বেশি কার্যকর ও কম খরচসাপেক্ষ। ২. উচ্চ উৎপাদনশীলতা (Higher Productivity): কম্বোডিয়ান শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা (Productivity) বাংলাদেশের শ্রমিকদের তুলনায় বেশি। মজুরি বেশি হলেও প্রতি ইউনিট পণ্য উৎপাদনে তাদের মোট ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম। ৩. ব্যবস্থাপনা দক্ষতা (Management Skills): তাদের ব্যবস্থাপনা দক্ষতা (Management Skills) এবং কারখানার অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলো (Internal Process) তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি কার্যকর ও আধুনিক।
উৎপাদনশীলতা বনাম মজুরি: Low-wage advantage-এর ঝুঁকি
বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাত এখনো বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে আছে, তবে এটি মূলত কম মজুরির ওপর নির্ভরশীল, যাকে ‘Low-wage advantage’ বলা হয়। শ্রমিকরা কঠোর পরিশ্রম করলেও প্রত্যাশিত গতিতে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতার উন্নয়ন ঘটেনি। কারখানার ব্যবস্থাপনা, শ্রমিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি হালনাগাদ (Technology Upgradation) এবং শ্রমনিয়োগকর্তা সম্পর্কের আধুনিকায়ন—এসব ক্ষেত্রে আমাদের আরও অনেক দূর যেতে হবে।
অন্যদিকে, কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো ক্রমশ ‘value-chain upgrading’-এর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অর্থাৎ, তারা শুধু শ্রমভিত্তিক নয়, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনানির্ভর প্রতিযোগিতার দিকে যাচ্ছে। ফলে তাদের শ্রমিকদের মজুরি বেশি হলেও সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় (Cost of Production) তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
বাণিজ্যের খরচ (Cost of Doing Business): অদৃশ্য বোঝা
বাংলাদেশের পোশাক খাতকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলার আরেকটি বড় কারণ হলো ‘cost of doing business’ বা ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ খরচ। এখানে কেবল আইনগত ফি নয়, লাইসেন্স, অনুমোদন, ট্যাক্স, বিদ্যুৎ সংযোগ, পোর্ট ক্লিয়ারেন্স—প্রায় সব জায়গায় অনানুষ্ঠানিক (Informal) ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খরচের (Non-institutional Cost) বোঝা ব্যবসায়ীদের ওপর চেপে বসে।
ফাহিম মাশরুরের মতে, এই অনানুষ্ঠানিক খরচগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SME) জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি বোঝাস্বরূপ। বড় ব্যবসাগুলো হয়তো এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, কিন্তু ছোট উদ্যোক্তারা এই লুকানো ব্যয় ও অনিশ্চয়তায় হোঁচট খান। ফলে উদ্ভাবন (Innovation) ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন থমকে যায়, যা দেশের শিল্প কাঠামোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করে।
ভবিষ্যতের পথ: High-productivity competitiveness অর্জন
বাংলাদেশের পোশাক খাত এখন এক সন্ধিক্ষণে (Crossroads) দাঁড়িয়ে আছে। কেবল মজুরি নয়—উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, শ্রমসম্পর্ক, সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা (Administrative Transparency)—সবকিছুর পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন।
কম্বোডিয়ার উদাহরণ আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার অন্তরায় নয়, যদি সেই মজুরির বিপরীতে দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ (Business-friendly Environment) থাকে। বরং ন্যায্য মজুরি শ্রমিকের প্রেরণা বাড়ায়, যা শেষ পর্যন্ত উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের জন্য তাই এখন সময় এসেছে ‘Low-wage advantage’-এর গণ্ডি পেরিয়ে ‘High-productivity competitiveness’ (উচ্চ উৎপাদনশীলতা সক্ষমতা) অর্জনের পথে যাত্রা শুরু করার। কারণ, শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতা শুধু কম মজুরির নয়—দক্ষতা, ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ এবং ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতারও।