• জীবনযাপন
  • ছোটদের চোখ লাল: কখন বুঝবেন সাধারণ অ্যালার্জি, আর কখন অ্যাডিনোভাইরাসের মতো 'ভাইরাল ইনফেকশন'? গুরুতর সংক্রমণ এড়ানোর উপায় কী?

ছোটদের চোখ লাল: কখন বুঝবেন সাধারণ অ্যালার্জি, আর কখন অ্যাডিনোভাইরাসের মতো 'ভাইরাল ইনফেকশন'? গুরুতর সংক্রমণ এড়ানোর উপায় কী?

জীবনযাপন ১ মিনিট পড়া
ছোটদের চোখ লাল: কখন বুঝবেন সাধারণ অ্যালার্জি, আর কখন অ্যাডিনোভাইরাসের মতো 'ভাইরাল ইনফেকশন'? গুরুতর সংক্রমণ এড়ানোর উপায় কী?

ধুলা, পোকার কামড় নাকি ব্যাকটেরিয়া? শিশুদের সংবেদনশীল চোখে লালচে ভাব আসা কেন চিন্তার, জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

শিশুদের ত্বক সহ বিভিন্ন অঙ্গ অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়। তাদের চোখের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গও অতি সংবেদনশীল হওয়ায় খুব সহজেই অ্যালার্জি বা সংক্রমণের শিকার হতে পারে। অনেক সময় বাচ্চাদের চোখ লাল হতে দেখা যায়, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় প্রধানত 'কনজাংটিভাইটিস'-এর লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। চোখ লাল হলে সেখানে শুষ্ক ভাব, চুলকানি ও জল পড়তে শুরু করতে পারে। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি সাধারণ অ্যালার্জিক রিয়্যাকশন (Allergic Reaction), তবে কিছু ক্ষেত্রে অ্যাডিনোভাইরাসের (Adenovirus) মতো গুরুতর সংক্রমণও এর পিছনে দায়ী হতে পারে। চোখ কেন লাল হয় এবং কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, তা জানাচ্ছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞ মতে শিশুদের চোখ লাল হওয়ার ৭টি প্রধান কারণ

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বাচ্চাদের চোখ লাল হওয়ার পিছনে একাধিক কারণ দায়ী থাকতে পারে। সেগুলির মধ্যে প্রধান ৭টি কারণ নিচে দেওয়া হলো:

১. ঘন ঘন চোখ ডলা বা ঘষা (Eye Rubbing): আপনার শিশু যদি বারবার চোখ ডলে বা ঘষে, তবে লালচে ভাব আসতে পারে। এটি চোখ লাল হওয়ার সাধারণ একটি কারণ এবং কিছুক্ষণের মধ্যে এটি নিজে থেকে ঠিক হয়ে যায়। তবে এই অভ্যাসের ফলে চোখে আঘাত লাগা বা জীবাণু প্রবেশ করার ঝুঁকি বাড়ে।

২. অ্যালার্জি ও আঘাত (Allergy and Trauma): ধুলা, ফুলের রেণু, পোষা প্রাণীর লোম, অথবা কোনো বিশেষ কসমেটিক বা সাবান/শ্যাম্পুর ব্যবহারের ফলে চোখে তীব্র অ্যালার্জিক রিয়্যাকশন (Allergic Reaction) হতে পারে। আবার খেলার সময় ছোটখাটো আঘাত লাগলেও চোখ লাল হয়ে জল পড়তে শুরু করে। এই ক্ষেত্রে ট্রিগার (Trigger) বস্তুটিকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

৩. ভাইরাল ইনফেকশন (Viral Infection): অ্যাডিনোভাইরাস (Adenovirus) বা হারপিসের (Herpes) মতো ভাইরাসগুলি শিশুদের চোখে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। এই ‘ভাইরাল ইনফেকশন’ অত্যন্ত ছোঁয়াচে হয় এবং সাধারণত চোখের কনজাংটিভাইটিস-এর প্রধান কারণ। এ কারণে চোখের ভিতরের অংশ লাল হয়ে যায় এবং প্রায়শই চোখ দিয়ে পরিষ্কার জল ঝরে।

৪. ব্যাক্টিরিয়াল ইনফেকশন (Bacterial Infection): সাধারণত হোমিফিলস (Haemophilus) বা স্ট্রেপ্টোকোকাস নিউমোনিয়া (Streptococcus Pneumoniae)-এর মতো ব্যাক্টিরিয়ার কারণে বাচ্চাদের চোখে সংক্রমণ দেখা দেয়। ‘ব্যাক্টিরিয়াল ইনফেকশন’-এর ক্ষেত্রে চোখ লাল হওয়ার পাশাপাশি চোখের মণি বা পাতার চারপাশে হলুদ অথবা সবুজ রঙের ঘন পুঁজ বা ডিসচার্জ (Discharge) দেখা যায়।

৫. পোকার কামড়: খেলাধুলা করার সময় বা বাইরে বেরোলে কোনো ছোট পোকা চোখে বা চোখের পাতায় কামড়ে দিতে পারে। অনেক সময় এটি নিজে থেকে ঠিক হয়ে গেলেও, মাঝেমধ্যে পোকার বিষক্রিয়ার ফলে গুরুতর অ্যালার্জি বা গৌণ সংক্রমণ (Secondary Infection) দেখা দিতে পারে।

৬. চোখের পাতার সমস্যা: অনেক সময় চোখের পাতায় ফোঁড়া (Stye) বা ব্লেফারাইটিস (Blepharitis)-এর মতো সমস্যা দেখা দেয়। এগুলি ব্যাক্টেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয় এবং চোখের পাতা ও সংলগ্ন অংশে লালচে ভাব ও ব্যথা তৈরি করে।

৭. নেত্রনালী বা টিয়ার ডাক্ট বন্ধ: বিশেষ করে নবজাতক ও ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে নেত্রনালী বা টিয়ার ডাক্ট (Tear Duct) বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে চোখ থেকে ক্রমাগত জল পড়তে থাকে এবং সেই স্থানে ব্যাক্টিরিয়া জমা হয়ে সংক্রমণ বা লালচে ভাব সৃষ্টি করতে পারে।

সংক্রমণ গুরুতর হলে বুঝবেন কীভাবে? জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা ও সতর্কতা

শিশুর চোখ লাল হয়ে গেলে আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। যদি কেবল লালচে ভাব থাকে এবং শিশু স্বাভাবিক থাকে, তবে এটি সাধারণ অ্যালার্জিক রিয়্যাকশন হতে পারে। তবে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি দেখা দিলে সংক্রমণটি গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে:

গুরুতর সংক্রমণের লক্ষণ (Red Flags) কেন চিন্তা করবেন? তীব্র লালচে ভাব ও ব্যথা ব্যথার কারণে শিশু চোখ খুলতে না পারলে বা ক্রমাগত কাঁদতে থাকলে। ঝাপসা দৃষ্টি বা আলো-সংবেদনশীলতা আলোর দিকে তাকালে চোখে তীব্র অস্বস্তি (ফট Lোফোবিয়া/Photophobia) হলে। ঘন হলুদ বা সবুজ পুঁজ এটি সাধারণত 'ব্যাক্টিরিয়াল ইনফেকশন'-এর স্পষ্ট লক্ষণ। জ্বর ও ক্লান্তি চোখের সংক্রমণের সাথে যদি উচ্চ জ্বর থাকে, তবে তা ভাইরাসের গুরুতর সিস্টেমিক ইনফেকশন নির্দেশ করে।

প্রাথমিক পদক্ষেপ:

১. ঠান্ডা জলের ঝাপটা: যদি ধুলা বা আঘাত লাগার ফলে এমন হয়, তবে তৎক্ষণাৎ ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিয়ে চোখ পরিষ্কার করুন। মোলায়েম, পরিষ্কার সুতির তোয়ালে দিয়ে আলতোভাবে চোখ মুছে দিন।

২. সুতির কাপড় দিয়ে সেঁক: আঘাত বা পোকার কামড়ের ফলে লাল হলে সুতির কাপড় হালকা গরম করে (সহনীয় তাপমাত্রা) চোখ সেঁক দিন। এতে ব্যথা ও ফোলা ভাব কমতে পারে।

৩. পণ্য পাল্টান: যদি কোনো নির্দিষ্ট সাবান বা শ্যাম্পুর ব্যবহারের পর অ্যালার্জিক রিয়্যাকশানের ফলে চোখ লাল হয়ে থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেই সামগ্রীগুলি পাল্টে ফেলুন।

৪. হাত ও পরিচ্ছন্নতা: সন্তানকে চোখ চুলকানো বা ডলা থেকে বিরত করুন। জীবাণু নখ থেকে চোখে প্রবেশ করতে পারে। নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করানো বাধ্যতামূলক।

৫. চিকিৎসকের পরামর্শ: চোখ যদি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভালো না হয়, তীব্র ব্যথা বা হলুদ-সবুজ পুঁজ দেখা যায়, তবে অবিলম্বে একজন শিশু বিশেষজ্ঞ (Paediatrician) বা চক্ষু বিশেষজ্ঞের (Ophthalmologist) পরামর্শ নিন। সংক্রমণ বা অ্যালার্জির ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো চোখের ড্রপ ব্যবহার করা উচিত নয়।