• জাতীয়
  • একই দিনে গণভোট ও নির্বাচন: দেশকে 'অস্থিতিশীলতার মুখে ঠেলছে' অন্তর্বর্তী সরকার, উপদেষ্টাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ‘জুলাই ঐক্য’র

একই দিনে গণভোট ও নির্বাচন: দেশকে 'অস্থিতিশীলতার মুখে ঠেলছে' অন্তর্বর্তী সরকার, উপদেষ্টাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ‘জুলাই ঐক্য’র

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
একই দিনে গণভোট ও নির্বাচন: দেশকে 'অস্থিতিশীলতার মুখে ঠেলছে' অন্তর্বর্তী সরকার, উপদেষ্টাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ‘জুলাই ঐক্য’র

দেড় বছরেও গণহত্যার বিচার ধীরগতিতে, প্রশাসনে ‘আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন’; জুলাই বিপ্লবের রক্ত নিয়ে ‘বেইমানি’র অভিযোগ ডাকসু নেতাদের।

জুলাই সনদের (July Charter) বাস্তবায়ন নিশ্চিতে জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (Interim Government) দেশকে এক মারাত্মক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শনিবার (১৫ নভেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এমন গুরুতর অভিযোগ এনেছে ‘জুলাই ঐক্য’। এই ঐক্যের সংগঠক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মাদ ইসরাফিল ফরাজীর পরিচালনায় আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

মুসাদ্দেক আলী তার মন্তব্যে বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর এই অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনকে মাত্র তিনটি মূল কাজের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তাদের কাজ ছিল—গণহত্যার বিচার সম্পন্ন করা, রাষ্ট্রীয় সংস্কার সাধন এবং একটি সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন (National Election) আয়োজন। কিন্তু সরকার এই তিনটি মূল এজেন্ডা (Agenda) বাস্তবায়ন না করে অন্য সব কাজ নিয়েই ব্যস্ত। সর্বশেষ জুলাই সনদ কার্যকর করার প্রক্রিয়া নিয়েও দেশকে একটি অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, এই সরকার চাঁদাবাজদের নিরাপত্তা দিচ্ছে এবং প্রশাসনে পূর্বতন শাসক দলের কর্মীদের ‘পুনর্বাসন’ করা হয়েছে। এসব কিছুই কয়েকজন উপদেষ্টার কারণে হচ্ছে।

সরকারের মূল তিন এজেন্ডা থেকে সরে আসা?

লিখিত বক্তব্যে জুলাই ঐক্যের সংগঠক ও ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের বলেন, জুলাই বিপ্লবের (July Revolution) প্রায় দেড় বছর অতিক্রান্ত হলেও বৈষম্যহীন, সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থান্বেষী চিন্তা ও ভোগবাদী মানসিকতার ফ্যাসিবাদী আচরণে (Fascist Behavior) ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।

তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিন দোদুল্যমান থাকার পর সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের তারিখ ঘোষণা করেছেন, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু এই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে স্বাক্ষর করেছেন 'ফ্যাসিবাদের সহযোগী' রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। রাজনৈতিক দলগুলোর অনৈক্য ও পরস্পরের রেষারেষিই এই ‘কলঙ্কের’ জন্ম দিয়েছে। যারা সনদটি বাস্তবায়নে বারবার বাধা দিয়েছে, ইতিহাসে তাদের এই দায় মেটাতে হবে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় ধোঁয়াশা

জাতীয় নির্বাচনের পূর্বেই গণভোট আয়োজনের জন্য জুলাই ঐক্য বারবার দাবি জানালেও সরকার কিছু রাজনৈতিক দলের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচনের দিনই গণভোটের (Referendum) আয়োজন করছে। জুবায়েরের মতে, এই গণভোট আয়োজনের প্রক্রিয়া নিয়ে জাতির সামনে বিরাট ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। এখনো জানানো হয়নি কোন প্রক্রিয়ায় এটি অনুষ্ঠিত হবে।

বিশেষ করে, রাজনৈতিক সহিংসতায় কোনো কেন্দ্রে ভোট স্থগিত হলে সে কেন্দ্রের গণভোটের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা বিশাল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই অস্পষ্টতা আগামী নির্বাচনকে একটি চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত দ্রুতই জনমনের এই বিভ্রান্তি দূর করে প্রক্রিয়াটি পরিষ্কার করা।

গণহত্যার বিচার ও প্রশাসনে পুনর্বাসন

জুবায়ের জোর দিয়ে বলেন, জুলাই বিপ্লবের দেড় বছর পরেও গণহত্যাকারী সংগঠন আওয়ামী লীগের বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। শত শত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে জামিন দেওয়া হচ্ছে, যা ‘জুলাইয়ের রক্তের সাথে বেইমানি’র সামিল। যদিও খুনি শেখ হাসিনার একটি মামলার রায়ের দিনক্ষণ ঘোষণা হওয়ায় তারা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। জুলাই ঐক্যের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়, জুলাই বিপ্লবসহ গত সতেরো বছরে আওয়ামী লীগের গুম, খুন ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে হবে এবং বিচার শেষে সংগঠনটিকে চিরতরে নিষিদ্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে, যারা এখনো 'আওয়ামী বয়ানে ন্যারেটিভ' তৈরির চেষ্টা করছে, সেই কাঠামোগত ও কালচারাল ফ্যাসিস্টদের (Cultural Fascists) বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

উপদেষ্টাদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার: স্বচ্ছতার দাবি

সাম্প্রতিক সময়ে কিছু উপদেষ্টার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুসারে, কিছু উপদেষ্টা জনস্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে বিভিন্ন দলের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নেই প্রধান কাজ মনে করছেন। মুসাদ্দেক আলী বলেন, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি একে অপরকে দোষারোপ করছে এবং ড. ইউনূসের কাছে তালিকা (Data/List) দিয়ে আসছে। অথচ রাষ্ট্রের মালিক দেশের জনগণের কাছে এই বিষয়গুলো পরিষ্কার করা হচ্ছে না। অবিলম্বে সব ‘জুলাইয়ের গাদ্দারদের’ নাম জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।

গণমাধ্যমের সূত্রে বিএনপি ও জামায়াত এমন কিছু উপদেষ্টার নাম সরকারকে দিয়েছে জানিয়ে জুবায়ের আশা প্রকাশ করেন যে, সেসকল উপদেষ্টাদের নাম ও কাজের বিবরণী জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা হবে। এছাড়াও, কিছু উপদেষ্টার আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রচার চলছে। জুলাই ঐক্যের দাবি, কোনো উপদেষ্টা নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে রাষ্ট্রীয় সুবিধা ব্যবহার করে নিজের নির্বাচনের মাঠ প্রস্তুত করার সুযোগ না নিয়ে এখনই দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করা উচিত।

কর্মসূচি ঘোষণা

সংবাদ সম্মেলনের শেষে ‘জুলাই ঐক্য’র কর্মসূচি ঘোষণা করেন মুসাদ্দেক আলী। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে:

আগামী ১৭ নভেম্বর: আওয়ামী লীগের অগ্নিসন্ত্রাস রুখতে সারাদেশে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান কর্মসূচি।

একই দিন: শাহবাগে জনতার আদালতে খুনি হাসিনার প্রতীকী ফাঁসি এবং ফ্যাসিবাদের দোসরদের প্রতীকী গণ পাথর নিক্ষেপ।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জুলাই ঐক্যের সংগঠক ও মঞ্চ ২৪-এর আহ্বায়ক ফাহিম ফারুকী, জাগ্রত জুলাইয়ের সভাপতি কবি বোরহান মাহমুদ এবং শিল্প উদ্যানের আহ্বায়ক মইন মুন্তাসিরসহ জুলাই ঐক্যের অন্যান্য নেতাকর্মীরা।