• জাতীয়
  • ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ড রায়: ‘হাসিনা ইস্যু’ কতটা জটিল করবে ভারত-বাংলাদেশ কৌশলগত সম্পর্ক?

ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ড রায়: ‘হাসিনা ইস্যু’ কতটা জটিল করবে ভারত-বাংলাদেশ কৌশলগত সম্পর্ক?

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ড রায়: ‘হাসিনা ইস্যু’ কতটা জটিল করবে ভারত-বাংলাদেশ কৌশলগত সম্পর্ক?

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক আহ্বান ঢাকার,

রায় পরবর্তী কূটনৈতিক টানাপোড়েন

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (International Crimes Tribunal - ICT) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করার পর বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনীতিতে এক নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের এই রায় ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে দুই দেশেই আলোচনা তুঙ্গে। আগামী তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। এমন পটভূমিতে নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে ‘শেখ হাসিনা ইস্যু’ দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক (Strategic Ties)-এ স্থায়ী বাধা হয়ে দাঁড়াবে কি না—তা নিয়েই এখন বিশেষ নজর রাজনীতি ও কূটনৈতিক মহলে।

গত বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের (Interim Government) সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দ্রুত তলানিতে নেমে যায়। এমন টানাপোড়েনের মধ্যে এই নতুন রায়ের পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে (Diplomatic Ties) আরও নতুন জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক দাবি ও ভারতের অবস্থান

ট্রাইব্যুনালের রায়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান মৃত্যুদণ্ড পান। আরেক অভিযুক্ত, সাবেক আইজিপি ও রাজসাক্ষী চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন পান পাঁচ বছরের কারাদণ্ড। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।

ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার পরপরই সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে আবারো অনুরোধ করা হবে। এর পরপরই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে অনতিবিলম্বে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের জন্য ভারত সরকারের প্রতি কঠোর আহ্বান জানায়।

যদিও এর আগেও অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের অনুরোধ করেছিল, তবে ভারত সরকার এ বিষয়ে তখন কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ভারত সরকারের এ বিষয়ে এ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক অবস্থান হলো— একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সুরক্ষা ও নিরাপত্তার কথা (Security Concern) ভেবে তাকে সে দেশে 'সাময়িক' (For the Time Being) আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।

‘মৃত্যু হুমকি’ ও আইনি জটিলতা: প্রত্যর্পণ চুক্তির বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, প্রত্যর্পণ (Extradition) একটি জটিল বিষয় এবং এ ক্ষেত্রে কাউকে প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে মৃত্যু হুমকি (Death Threat)-র বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনে গুরুত্ব পেয়ে থাকে।

তিনি বলেন, "বাংলাদেশে তো শেখ হাসিনার মামলায় মৃত্যুদণ্ডই দেওয়া হয়েছে। ফলে সেই হুমকিটি তো আছেই। ফলে আপাতত এটুকু বোঝা যাচ্ছে যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের সরকারের মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিক হচ্ছে না।"

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে যে প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty) রয়েছে, তাতে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরই হস্তান্তরের অনুরোধ করার সুযোগ থাকে। তবে ওই চুক্তিতে এমন অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত আছে, যা বিবেচনা করে ভারতের পক্ষে এমন অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের সুযোগও রয়েছে। শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, বাংলাদেশের আদালতে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর এখন এটা পরিষ্কার যে, বাংলাদেশে তার মৃত্যু হুমকি রয়েছে। ভারত সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই কারণটিই তাকে হস্তান্তর না করার জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচিত হতে পারে।

সম্পর্ক তলানিতে: নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ

ইউনূস সরকারের সময়েই ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক ক্রমশ অবনতির দিকে গেছে। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে ভারত বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা সীমিত (Visa Limitation) করেছে; পর্যটন ভিসা বন্ধ রয়েছে এবং মেডিকেল ভিসাও পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দল ও নেতা ভারতবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন—যা দিল্লির কাছে আরও নেতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। ভারতের আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে হামলার ঘটনাও সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের (Interim Government) সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক ভারতের নিরাপত্তা মহলে ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ (Geopolitical Concern) সৃষ্টি করেছে।

নির্বাচনের পর ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কোন পথে?

আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে—এমনটাই মত কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, এখানে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—নতুন সরকার কেমন হবে, ভারত সেই সরকারের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক চাইবে এবং শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ কতটা সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা নেয়।

তাঁর মতে, নতুন সরকার শেখ হাসিনা ইস্যুকে পাশে রেখে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে পারে। আবার এটিকে কেন্দ্র করে চাপ তৈরির কৌশল (Diplomatic Tool)-ও নিতে পারে ভবিষ্যৎ সরকার। অন্যদিকে শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, নতুন সরকারও সম্ভবত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ করবে, তবে এই একটি মাত্র ইস্যু ধরে রাখলে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নতি পাবে না।

Tags: interim government sheikh hasina india bangladesh extradition security concern diplomatic ties ict verdict geopolitical