ওয়াশিংটনের আকাশ-বাতাসে এখন পরিবর্তনের সুর। ২০১৮ সালের সেই অস্বস্তিকর ‘খাশোগি অধ্যায়’ যেন বিস্মৃতির অতলে। হোয়াইট হাউসের লনে লালগালিচা সংবর্ধনা, অশ্বারোহী বাহিনীর স্কর্ট আর সামরিক কুচকাওয়াজ জানিয়ে দিল—সৌদি-মার্কিন সম্পর্কের বরফ গলেছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের (MBS) এই সফরকে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা দেখছেন ‘ভবিষ্যৎ বাদশাহ’-র রাজকীয় ও কৌশলগত বিজয়ের প্রতীক হিসেবে।
সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যিনি কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন, সেই এমবিএস-কেই এবার বরণ করে নেওয়া হলো নজিরবিহীন আড়ম্বরে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আতিথেয়তায় সৌদি যুবরাজ ফিরে পেলেন তাঁর হৃত ‘Political Leverage’ বা রাজনৈতিক প্রভাব।
জমকালো নৈশভোজ ও নক্ষত্রের মেলা
হোয়াইট হাউসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আয়োজিত নৈশভোজটি ছিল তারকাবহুল। সেখানে কেবল কূটনীতিকরাই নন, উপস্থিত ছিলেন প্রযুক্তি ও ক্রীড়া জগতের মহাতারকারাও। টেসলা ও স্পেসএক্স-এর সিইও ইলন মাস্ক, অ্যাপলের টিম কুক এবং ফুটবল সুপারস্টার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর উপস্থিতি প্রমাণ করে, রিয়াদ এখন আর কেবল তেলের খনি নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ‘Soft Power’-এর নতুন কেন্দ্রবিন্দু।
প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তির নতুন সমীকরণ
সফরের ঝুলিও বেশ ভারী। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বড়সড় ‘Defense Deal’ বা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিশ্চিত করার পথে অনেকটা এগিয়েছে সৌদি আরব। আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে অত্যাধুনিক ‘F-35 Fighter Jet’ বিক্রির প্রতিশ্রুতি এবং সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে মার্কিন সহায়তা। এমনকি সৌদিকে ‘Non-NATO Major Ally’-র মর্যাদা দেওয়ার বিষয়েও ইতিবাচক ইঙ্গিত মিলেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সৌদি সংবাদমাধ্যমগুলোতে এই সফরকে দেখা হচ্ছে এক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে। আরব নিউজের প্রধান সম্পাদকের মতে, দুই দেশের সম্পর্ক এখন আর প্রথাগত তেল ও নিরাপত্তার বৃত্তে আটকে নেই। মহাকাশ গবেষণা, ‘Artificial Intelligence (AI)’ এবং উচ্চ প্রযুক্তির আদান-প্রদান দুই দেশের ‘Strategic Partnership’-কে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ইসরায়েল ইস্যুতে সৌদি আরবের শর্ত
ট্রাম্প প্রশাসন রিয়াদ ও তেল আভিবের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ বা ‘Normalization’ ত্বরান্বিত করতে চাইলেও, যুবরাজ তাঁর অবস্থানে অনড়। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, এমবিএস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সম্ভব, তবে তার আগে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য ‘Roadmap’ টেবিলে থাকতে হবে।
কার্নেগি মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু লেবারের মতে, এই সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এমবিএসের প্রতি ওয়াশিংটনের পূর্ণ সমর্থন পুনর্বহাল হওয়া। এটি প্রমাণ করে দিল, আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্পর্কের চালকের আসনে এমবিএস-ই থাকছেন এবং ওয়াশিংটন তাঁকে উপেক্ষা করে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো নীতি বাস্তবায়ন করতে পারবে না।