• মতামত
  • ‘অদৃশ্য শক্তি’ থেকে গণতন্ত্রের ‘অনিবার্য চরিত্র’: তারেক রহমানের রাজনৈতিক রূপান্তর ও আগামীর বাংলাদেশ

‘অদৃশ্য শক্তি’ থেকে গণতন্ত্রের ‘অনিবার্য চরিত্র’: তারেক রহমানের রাজনৈতিক রূপান্তর ও আগামীর বাংলাদেশ

মতামত ১ মিনিট পড়া
‘অদৃশ্য শক্তি’ থেকে গণতন্ত্রের ‘অনিবার্য চরিত্র’: তারেক রহমানের রাজনৈতিক রূপান্তর ও আগামীর বাংলাদেশ

লন্ডন প্রবাসে থেকেও যেভাবে ‘ডিজিটাল কৌশলে’ বিএনপিকে পুনর্গঠন করলেন; সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার প্রশ্নে তারেক রহমানের ‘স্ট্র্যাটেজিক ভিশন’ ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নতুন বয়ান

বাংলাদেশের রাজনীতির Political Landscape-এ এমন কিছু চরিত্র রয়েছে, যাদের শারীরিক উপস্থিতি দৃশ্যমান না হলেও তাদের প্রভাব এক অদৃশ্য শক্তির মতো সর্বত্র বিরাজমান। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিঃসন্দেহে সেই তালিকার শীর্ষ নাম। সুদূর লন্ডনের প্রবাস জীবন থেকেও তিনি যেভাবে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করেছেন, দলীয় কাঠামোতে Modernization বা আধুনিকায়ন এনেছেন এবং স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন—তা আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষকের সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে তারেক রহমানের এই রাজনৈতিক বিবর্তনের চিত্র।

প্রথাগত রাজনীতির বাইরে: আধুনিকায়ন ও তৃণমূলের সঙ্গে সংযোগ

রাজনীতিতে তারেক রহমানের অভিষেক হয়েছিল অনেকটা প্রথা ভাঙার গান গেয়ে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে আবির্ভূত হয়ে তিনি কেবল গতানুগতিক নেতৃত্ব দেননি, বরং দলের ভেতরে Corporate Style-এ দায়িত্ব বণ্টন এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি চালু করার চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের সনাতনী রাজনীতির ধারায় তিনি যুক্ত করেন তথ্যপ্রযুক্তি ও তরুণ নেতৃত্বের সংমিশ্রণ।

বিশেষ করে, তার ‘রাজনীতি মানুষের দোরগোড়ায়’—এই দর্শনটি বিএনপির Grassroots বা তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের বিজয়ের নেপথ্যে তার এই সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং স্থানীয় নেতাদের ক্ষমতায়ন ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করেছিল। সেই সময়েই তিনি দলীয় কার্যালয়ে নিয়মিত তৃণমূলের সঙ্গে One-on-One বৈঠক এবং নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তরুণদের সম্পৃক্ত করে নিজের ‘উদীয়মান ক্ষমতার’ জানান দিয়েছিলেন।

১/১১-এর সংকট ও ‘রিমোট লিডারশিপ’-এর উত্থান

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে ২০০৭ সালের ১/১১-এর ঘটনা এক বড় বাঁকবদল। সে সময় তারেক রহমান গ্রেপ্তার হন এবং ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন। পরবর্তীতে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার পর শুরু হয় তার রাজনৈতিক নির্বাসনের অধ্যায়। তবে এই নির্বাসন তাকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি, বরং তাকে এক ভিন্নধর্মী Strategic Leader-এ রূপান্তর করেছে।

লন্ডনে অবস্থান করেও তিনি হয়ে ওঠেন দলের ‘দূরনিয়ন্ত্রিত কাণ্ডারি’। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪—টানা তিনটি প্রশ্নবিদ্ধ জাতীয় নির্বাচনের সময় তিনি Remote Leadership-এর এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দলের ভেতরে-বাইরে বার্তা পৌঁছানো, নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখা এবং সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে তিনি প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করেছেন।

ডিজিটাল পলিটিক্স ও এনক্রিপ্টেড নেটওয়ার্ক

গত দেড় দশকে বিরোধী দলের ওপর আসা অবর্ণনীয় চাপ ও রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান দল পরিচালনায় অভিনব Digital Political Model প্রয়োগ করেছেন। প্রথাগত বৈঠকের বদলে Virtual Meeting, নিরাপদ ও Encrypted Network-এর মাধ্যমে দলীয় গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আদান-প্রদান এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের (Diaspora) নিয়ে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন—এসবই ছিল তার কৌশলের অংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, তিনি কেবল লন্ডন থেকে দলীয় নির্দেশনাই দেননি, বরং দেশীয় রাজনীতিকে আন্তর্জাতিক সংযোগের মাধ্যমে বা Global Connectivity-র মাধ্যমে নতুনভাবে শক্তিশালী করেছেন। তার এই কৌশলী অবস্থানের কারণেই চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও বিএনপি সাংগঠনিকভাবে টিকে থাকার সক্ষমতা দেখিয়েছে।

জাতীয়তাবাদের নতুন বয়ান: সার্বভৌমত্ব ও আত্মনির্ভরতা

একুশ শতকের বদলে যাওয়া Geopolitics বা ভূরাজনীতির বাস্তবতায় তারেক রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞাকে আরও বিস্তৃত করেছেন। তার রাজনৈতিক দর্শন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি জাতীয়তাবাদকে কেবল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ফ্রেমে আটকে রাখেননি; বরং এর সঙ্গে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে যুক্ত করেছেন।

তারেক রহমানের বর্তমান রাজনীতির মূল ভিত্তি তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: ১. সার্বভৌমত্ব রক্ষা: জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন রাখা। ২. অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা: পরনির্ভরশীলতা কমিয়ে Economic Self-reliance অর্জন। ৩. গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষা: ভোটাধিকার ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একপাক্ষিকতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের এই ত্রিমাত্রিক ভিশন বা Vision তাকে একজন আধুনিক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করছে।

ইতিহাসের মোড় ও আগামীর নেতৃত্ব

নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তার নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘‘ইতিহাস কারও জন্য অপেক্ষা করে না; কিন্তু ইতিহাসের মোড় ঘোরে কিছু মানুষের কারণে। তারেক রহমান সেই মোড়ের একজন সম্ভাব্য নির্মাতা।’’

আজকের বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে তারেক রহমান আর কেবল একটি দলের নেতা নন, বরং তিনি এক বিশাল জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। যারা গণতন্ত্রকে পুনর্গঠন ও টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে বিশ্বাসী, তাদের কাছে তিনি এক অনিবার্য চরিত্র। গণতন্ত্রের দীর্ঘ পথচলায় এবং আগামীর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে তারেক রহমানের ভূমিকা যে কেন্দ্রীয় এবং সিদ্ধান্তমূলক হতে যাচ্ছে, তা এখন আর অনুমানের বিষয় নয়—বরং সময়ের বাস্তবতা।

Tags: national election tarique rahman bnp politics bangladesh democracy grassroots leader digital politics geopolitical strategy political exile