প্রায় ৪০০ কোটি টাকার বিশাল ঋণের বোঝা বা Financial Liability কাঁধে নিয়ে ধুঁকছে বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি)। ঠিকাদারদের বকেয়া বিল, বিদ্যুৎ বিল এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের পাওনা পরিশোধে যখন হিমশিম খাচ্ছে সংস্থাটি, ঠিক তখনই সমুদ্রশহর কুয়াকাটায় রিসোর্ট নির্মাণের মতো ‘উচ্চাভিলাসী’ ও ‘বিলাসী’ প্রকল্প হাতে নেওয়ায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নাগরিক সেবা নিশ্চিত না করে জনগণের করের টাকায় এমন বাণিজ্যে নামার সিদ্ধান্তকে ‘আত্মঘাতী’ বলে অভিহিত করেছে গণসংহতি আন্দোলন।
বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) দুপুরে বরিশাল জেলা গণসংহতি আন্দোলনের নেতারা এক সংবাদ সম্মেলনে এই প্রকল্প বাতিলের জোর দাবি জানান। ইতিমধ্যে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে হাইকোর্ট জমি ক্রয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা Stay Order জারি করেছেন।
ঋণের পাহাড়ে বিসিসি: বকেয়ার ভয়াবহ চিত্র
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের জেলা সমন্বয়ক দেওয়ান আব্দুর রশিদ নীলু বিসিসির ভয়াবহ আর্থিক সংকটের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, বর্তমানে সিটি করপোরেশনের ঘাড়ে প্রায় ৩৮৪ কোটি টাকার দেনা রয়েছে। এর মধ্যে উন্নয়ন কাজের ঠিকাদারদের বকেয়া বিল বাবদ পাওনা প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগ পাবে ৬৪ কোটি টাকা। এছাড়া, জীবন সায়াহ্নে এসে অবসরপ্রাপ্ত ও চাকরিচ্যুত নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারীরা তাদের পাওনা ২০ কোটি টাকার জন্য দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন।
এমন এক নাজুক পরিস্থিতিতে বা Financial Crisis-এর মধ্যে কুয়াকাটায় রিসোর্ট করতে ১৭ কোটি টাকায় জমি কেনার প্রজেক্ট এবং তড়িঘড়ি করে ৫ কোটি টাকা ‘বায়না’ বা Advance Payment করার ঘটনা বিসিসির অগ্রাধিকার বা Priority নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
নাগরিক দুর্ভোগ বনাম বিলাসিতা
দেওয়ান আব্দুর রশিদ নীলু অভিযোগ করেন, নগরবাসী যখন ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত, তখন করপোরেশন ব্যস্ত ব্যবসায়িক প্রজেক্ট নিয়ে। তিনি বলেন, ‘‘নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা Waste Management ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা শোচনীয়। মশক নিধন ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে নেই কার্যকর উদ্যোগ। বর্জ্য অপসারণে নিয়োজিত পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা কোনো ধরনের Safety Gear বা নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই কাজ করছেন, যা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। অথচ এসব অত্যাবশ্যকীয় খাতের উন্নয়ন না করে জনগণের টাকায় বিলাসিতা করার অধিকার কর্তৃপক্ষের নেই।’’
হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ ও নিষেধাজ্ঞা
বিসিসির এই ‘জনস্বার্থবিরোধী’ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গত ১৬ নভেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন বা Writ Petition দায়ের করেন দেওয়ান আব্দুর রশিদ নীলু। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে গত ১৭ নভেম্বর হাইকোর্ট বিসিসির এই প্রকল্পের জন্য জমি ক্রয় কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। একই সঙ্গে আগামী ৬ মাসের জন্য সকল কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত। একে বরিশালের সচেতন নাগরিক সমাজ ‘স্বস্তিদায়ক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
কর্তৃপক্ষের অস্পষ্ট বক্তব্য
অন্যদিকে, এত বড় ঋণের মাঝেও রিসোর্ট প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বিসিসির সম্পত্তি কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান শাকিল সংবাদমাধ্যমকে জানান, মাসিক সভায় এই রিসোর্ট করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বা Tender Process-এ তিনটি আবেদন জমা পড়ে, যার ভিত্তিতে ৫ কোটি টাকা বায়না করা হয়েছে। তবে ঠিক কোন দাগের বা কোন নির্দিষ্ট জমির ওপর এই বিশাল অংকের টাকা বায়না করা হয়েছে, তা তিনি তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেননি, যা পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বা Transparency নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করেছে।