শততম টেস্টের মঞ্চকে আপন আলোয় উদ্ভাসিত করলেন মুশফিকুর রহিম। দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরিতে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখালেন রিকি পন্টিং, জো রুটদের মতো কিংবদন্তিদের পাশে। ৩৬ বছর বয়সেও প্রমাণ করলেন, তিনি ফুরিয়ে যাননি, বরং হয়েছেন আরও পরিণত। তবে ব্যক্তিগত এই অর্জনের দিনেও তার ভাবনায় শুধুই দল। জানালেন, ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর আগে তিনি জাতীয় দলের জন্য অন্তত একজন-দুজন বিকল্প তৈরি করে দিয়ে যেতে চান।
বৃহস্পতিবার ঢাকা টেস্টের দ্বিতীয় দিনে সেঞ্চুরি পূর্ণ করার পর সংবাদ সম্মেলনে এসে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অনুভূতির কথা জানান বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই মহীরুহ।
মাইলফলকের চাপ নয়, অভিজ্ঞতাই ছিল চালিকাশক্তি
আগের দিন ৯৯ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছেড়েছিলেন। শততম টেস্টে সেঞ্চুরির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে এমন স্নায়ুচাপ সামলানো যেকোনো ক্রিকেটারের জন্যই কঠিন। কিন্তু মুশফিক ছিলেন অবিচল। অভিজ্ঞতার ঝুলিই তাকে শান্ত রেখেছে বলে জানান তিনি।
এই প্রসঙ্গে মুশফিক বলেন, “১০০ টেস্ট তো অনেক লম্বা সময়, এই সময়ে এই বিষয়গুলো শিখে গেছি। আমি শুধু সেট হওয়ার এবং মস্তিষ্ক ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করেছি। ক্যারিয়ারের প্রতিটি দিন আমি চেষ্টা করি কীভাবে আরও উন্নতি করা যায় এবং এটাই আমার ক্যারিয়ারের সবচাইতে বড় হাইলাইট পয়েন্ট।” তার এই মন্তব্যেই স্পষ্ট, কেন তিনি বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ দলের ব্যাটিংয়ের অন্যতম স্তম্ভ।
ব্যক্তিগত অর্জন নয়, দলের জয়ই মূল লক্ষ্য
শততম টেস্ট খেলার গৌরবময় মুহূর্তেও মুশফিকের কাছে দলই ছিল সবার আগে। ম্যাচের আগে দলের উদ্দেশ্যে দেওয়া বার্তায় তিনি নিজের মাইলফলকের চেয়ে দেশের জয়কেই বড় করে দেখেছেন। তিনি বলেন, “১০০ ম্যাচ বা যেকোনো মাইলফলক সবসময়ই একটা অর্জন। কিন্তু আমার কাছে সবসময় বাংলাদেশ দলই এগিয়ে। দলের মধ্যে এই বার্তাটাই দেওয়ার চেষ্টা করেছি যে আমার জন্য নয়, দেশের জন্য যেন আমরা খেলি। এই ম্যাচে জয়টাই হবে আমার জন্য সবচেয়ে বড় উপহার।”
শুধু খেলে যাওয়াই নয়, ভবিষ্যৎ গড়তেও দায়বদ্ধ
ক্যারিয়ারের গোধূলিবেলায় দাঁড়িয়েও মুশফিকের ভাবনায় দলের ভবিষ্যৎ। তিনি শুধু একজন খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, একজন অভিভাবক হিসেবেও নিজের দায়িত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের খেলোয়াড় হয়ে কেউ ১০০ টেস্ট খেলবে, এটা আমি নিজেও বিশ্বাস করতে পারতাম না। এটা অনেক বড় অর্জন। এই কারণে আমার দায়িত্বটাও একটু বেশি। চেষ্টা করব আমি যাওয়ার আগে ড্রেসিংরুমে এমন পরিবেশ তৈরি করতে, যাতে দুই-একজন খেলোয়াড় তৈরি থাকে এবং আমার অভাবটা পূরণ হয়।”
আবেগের অর্ঘ্য: শতক উৎসর্গ করলেন প্রয়াত স্বজনদের
এই বিশেষ সেঞ্চুরিটি মুশফিক উৎসর্গ করেছেন তার প্রয়াত দাদা-দাদী এবং নানা-নানিকে। আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, “তাঁরা যখন বেঁচে ছিলেন, আমার সবচেয়ে বড় ভক্ত ছিলেন। আমার এখনও মনে আছে, অসুস্থ অবস্থায় তারা বলেছিলেন, ‘ভাই, তোমার খেলা দেখার জন্য হলেও আরও কিছুদিন বাঁচতে চাই।’ তাদের দোয়াতেই আমি আজকে এই পর্যায়ে। এই বিশেষ অর্জন আমি তাদেরকেই উৎসর্গ করতে চাই।”
সাফল্যের নেপথ্যে স্ত্রীর ‘সবচেয়ে বড় ত্যাগ’
ক্রিকেট ক্যারিয়ারে তার স্ত্রীর অবদানকেও অকপটে স্বীকার করেছেন মুশফিক। জানিয়েছেন, অনুশীলনে বাড়তি সময় দেওয়া থেকে শুরু করে মানসিক স্বস্তিতে রাখার পেছনে তার স্ত্রীর ত্যাগই সবচেয়ে বড়।
কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমার ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বেশি সমর্থন স্ত্রী দিয়েছে। আমি অন্য সবার চেয়ে বেশি অনুশীলন করি, এটা সম্ভব হতো না যদি ঘরে ওইরকম পরিবেশ না থাকত। আমাদের যৌথ পরিবারে সবার প্রত্যাশা পূরণ করা, আমার দুটো বাচ্চার করা... আমার একদিনও নির্ঘুম রাত কাটেনি। পুরোটা সময় সে-ই রাত জেগে বাচ্চাদের সামলেছে। আমি তার কাছে অনেক অনেক কৃতজ্ঞ।”
আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে নিজের শততম টেস্টে ১০৬ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলেছেন মুশফিক। এটি তার টেস্ট ক্যারিয়ারের ১৩তম সেঞ্চুরি। এই ইনিংসের মাধ্যমে তিনি আবারও প্রমাণ করলেন, বয়স শুধু একটি সংখ্যা মাত্র।