• দেশজুড়ে
  • ভয়ংকর পূর্বাভাস: ঢাকা ও আশপাশে স্বল্প সময়ে আরও ২০টি ভূমিকম্পের আশঙ্কা—বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

ভয়ংকর পূর্বাভাস: ঢাকা ও আশপাশে স্বল্প সময়ে আরও ২০টি ভূমিকম্পের আশঙ্কা—বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
ভয়ংকর পূর্বাভাস: ঢাকা ও আশপাশে স্বল্প সময়ে আরও ২০টি ভূমিকম্পের আশঙ্কা—বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

দুই দিনে চারবার কম্পন: নরসিংদীকে উৎপত্তিস্থল হিসেবে চিহ্নিত করে বুয়েট বিশেষজ্ঞের সতর্কবার্তা; গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় গোপন ফল্ট এবং বাংলাদেশের ‘রিং অব ফায়ার’-এর মতো ঝুঁকি।

চলতি সপ্তাহে ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায় দুই দিনের ব্যবধানে চারবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় জনমনে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীতে এবং একটি ঢাকায়। শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকালে একটি এবং শনিবার (২২ নভেম্বর) দিনের বিভিন্ন সময়ে আরও তিনটি ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়। এই আকস্মিক কম্পন বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আরও প্রায় ২০ বার ভূকম্পন হতে পারে বলে চরম আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

ভূমিকম্পের তীব্রতা ও ক্ষয়ক্ষতি

শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকালে ঢাকা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার যে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়, তার উৎস ছিল নরসিংদীর মাধবদীতে। উৎপত্তিস্থলের গভীরতা ভূপৃষ্ঠ থেকে ছিল মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, ভূপৃষ্ঠ থেকে উৎপত্তিস্থলের গভীরতা যত কম হয়, ভূকম্পনের ঝাঁকুনি তত বেশি হয়। এই দিনের ভূকম্পনের তীব্রতা ছিল স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, যার প্রভাবে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র ঝাঁকুনি অনুভূত হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় শিশুসহ ১০ জন নিহত হন এবং ৬ শতাধিক মানুষ আহত হন।

আগামী এক সপ্তাহে আরও ২০ বার কম্পনের সতর্কতা

সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের প্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আরও প্রায় ২০ বার ভূকম্পন হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী এই আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, "দুই দিনে চারবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে আরও ২০ বার এমনটি হতে পারে।" তিনি সতর্ক করে বলেন, "যদি ৫.৭ মাত্রার চেয়েও বড় কোনো ভূমিকম্প হয়, তাহলে স্বল্প সময়ের মধ্যে ভয়াবহ দুর্যোগ ঘটতে পারে।" তিনি নরসিংদীকে এই ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তিস্থল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

মেগাথার্স্ট ফল্ট ও ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের হুঁশিয়ারি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ মূলত ভারত, ইউরেশিয়া ও বার্মা—মোট তিনটি টেকটোনিক প্লেটের (Tectonic Plate) সংযোগস্থলে অবস্থিত। ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের রুবাইয়াত কবির জানান, "প্লেটগুলো এখন আটকানো অবস্থা থেকে খুলে যাচ্ছে।" তাঁর মতে, ভারতীয় প্লেট যদি ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটায়, তাহলে বাংলাদেশ মারাত্মক ভূমিকম্প ঝুঁকিতে পড়বে।

এর চেয়েও ভয়াবহ আশঙ্কার কথা জানায় কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা। সেই গবেষণায় গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় একটি গোপন ভূ-চ্যুতি (Fault) বা ফাটল শনাক্ত করা হয়েছে, যা বাংলাদেশে ৯ মাত্রার মেগা-ভূমিকম্প হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার ২০১৬ সালের গবেষণার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় শনাক্ত হওয়া ‘মেগাথার্স্ট ফল্ট’ (Megathrust Fault) পললস্তরের নিচে মাইলজুড়ে বিস্তৃত। তিনি আরও সতর্ক করেন যে, সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত প্লেট সংযোগস্থলে গত ৮০০ থেকে হাজার বছরের মধ্যে জমে থাকা শক্তি মুক্ত হয়নি। ফলে এই অঞ্চল ‘রিং অব ফায়ার’ (Ring of Fire)-এর মতোই বিপজ্জনক।

ভূতাত্ত্বিক গবেষণা ও প্রস্তুতি

এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ ঘোড়াশালের ফাটল থেকে সংগ্রহ করা মাটি পরীক্ষা করছে। বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আ স ম ওবায়দুল্লাহ বলেন, নমুনা পরীক্ষা করে ভূমিকম্পের গভীরতা ও প্রকৃতি নিশ্চিত হওয়া যাবে, যা ভবিষ্যতের প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা চূড়ান্তভাবে সতর্ক করেছেন যে, টেকনাফ-মিয়ানমার ফল্ট লাইনে ১৭৬২ সালে ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল, যার প্রভাবে সেন্টমার্টিন দ্বীপ ৩ মিটার উপরে উঠে আসে। সেই অঞ্চলে নতুন করে শক্তি সঞ্চয় হচ্ছে। প্লেটের চলনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ভূমিকম্পের জন্য প্রস্তুতি ও পরিকাঠামো উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

Tags: natural disaster dhaka bangladesh earthquake seismic risk tectonic plate buet expert norosingdi megathrust fault ring of fire