শিল্পনগরী গাজীপুরের কালিয়াকৈরে শুক্রবার বিকেলে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রকম্পিত হয়ে ওঠে বোর্ডমিল এলাকা। একটি প্লাস্টিক কারখানায় উৎপাদন চলাকালীন অতিরিক্ত তাপে বা ‘ওভারহিটিং’ (Overheating) এর কারণে মেশিন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বিকট শব্দের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া আগুনের লেলিহান শিখায় গুরুতর দগ্ধ হয়েছেন দুই শ্রমিক। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় স্থানীয় হাসপাতাল থেকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (DMCH) বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়েছে।
উৎপাদন চলাকালীন ভয়াবহ বিস্ফোরণ
শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে উপজেলার বোর্ডমিল এলাকায় অবস্থিত ‘মদিনা পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ কারখানায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও কারখানার শ্রমিকরা জানান, বিকেলের শিফটে প্লাস্টিকের পানির ট্যাংক (Plastic Water Tank) তৈরির কাজ চলছিল পুরোদমে। হঠাৎ করেই একটি মোল্ডিং মেশিন অস্বাভাবিক গরম হয়ে ওঠে এবং মুহূর্তের মধ্যে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ (Explosion) ঘটে।
বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে মেশিনে আগুন ধরে যায় এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় মেশিনের খুব কাছে কাজ করতে থাকা দুই শ্রমিক আগুনের গ্রাসে পড়েন। কারখানার অন্য শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসেন এবং ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার মাধ্যমে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন।
আগুনের গ্রাসে দুই প্রাণ: চিকিৎসকের ভাষ্য
আগুনে দগ্ধ দুই শ্রমিক হলেন—উপজেলার মাটিকাটা এলাকার মো. বাবুল হোসেন (১৮) এবং পূর্ব চান্দরা এলাকার মো. রবিউল ইসলাম (২৩)। সহকর্মীরা তাদের উদ্ধার করে দ্রুত সফিপুর এলাকার মডার্ন হাসপাতালে নিয়ে যান।
সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানকারী চিকিৎসক তানিয়া আক্তার জানান, আহতদের অবস্থা বেশ গুরুতর। বিশেষ করে কিশোর শ্রমিক বাবুল হোসেনের শরীরের প্রায় ৪৫ শতাংশ গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে (Deep Burn), যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। অন্যদিকে রবিউল ইসলামের শরীরের ১৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাদের উন্নত চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে রেফার করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য
দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, ‘পানির ট্যাংক তৈরির একটি মেশিনে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অতিরিক্ত তাপমাত্রা সৃষ্টি হয়, যা থেকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিস্ফোরণ ঘটে। আমাদের দুজন শ্রমিক আহত হয়েছেন। দগ্ধ শ্রমিকদের চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয় ও ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে কর্তৃপক্ষ।’
অন্যদিকে, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট। ফায়ার ফাইটার মনির হোসেন জানান, ‘আমাদের টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই কারখানার শ্রমিক ও স্টাফরা আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিলেন, যার ফলে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে। আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি এবং দগ্ধদের হাসপাতালে পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছি।’
শিল্প অধ্যুষিত গাজীপুরে কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা ‘সেফটি প্রটোকল’ (Safety Protocol) নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। যান্ত্রিক ত্রুটি নাকি রক্ষণাবেক্ষণের অভাব—এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় শ্রমিক নেতারা।